এমসি কলেজের পেছনে মন্দিরের নির্জন টিলায় কেউ গেলেই করা হতো ‘ব্ল্যাকমেইল’

Chattala24
  • 11
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares

সিলেট এমসি কলেজের পেছন দিকে রয়েছে  মন্দিরের একটি নির্জন টিলা। যারা এমসি’র ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান তারা এক সময় ঘুরে ঘুরে টিলার কাছে চলে যান। আর ওখানে গেলেই ঘটতো বিপত্তি। ছাত্রলীগের সাইফুরের নেতৃত্বে ওই চক্রের সদস্যরা মন্দিরের টিলায় বসে আড্ডা ও ইয়াবা সেবন করতো। আর কেউ গেলেই ‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হতো। প্রেমিক-প্রেমিকা হলে তাকে ছবি তুলে আদায় করা হতো মুক্তি পণ। স্বামী-স্ত্রী গেলে কখনো কখনো স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হতো।

এমন ঘটনা ওই টিলায় ঘটেছে অহরহ। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিকার পেতেন না। সম্ভ্রম, টাকা-স্বর্ণালংকার ওদের কাছে বিলিয়ে দিয়ে ফিরতে হতো শূন্য হাতে। এমসির ছাত্রাবাসে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনার পর খবর পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বাবলা চৌধুরী। বিকাল হলেই তার চোখ থাকতো এমসির ক্যাম্পাস, হোস্টেল কিংবা পাশের আলুরতল। প্রায়ই এ ধরনের ঘটনার খবর আসে তার কাছে। এ কারণে সবার আগে এমসির ছাত্রাবাসের ঘটনার খবর এসেছিলো তার কাছে। তিনি গিয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই নারীকে উদ্ধার করেন। বাবলা চৌধুরী জানান- এমসি কলেজ ও আশপাশের এলাকায় গত ৫ বছরে একাধিক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ভুক্তভোগীরা এসে বিচার দাবি করলেও কিছু করতে পারিনি। এ কারণে তার নেতৃত্বে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী মোটরসাইকেল নিয়ে নানা জায়গায় পাহারা দিতো। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই করা হতো প্রতিবাদ। উদ্ধার করা হতো নির্যাতিতা কিংবা ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া নারী-পুরুষদের। বাবলা চৌধুরী জানিয়েছেন বছর দু’য়েক আগের একটি ঘটনা। একদিন বিকালে জগন্নাথপুরের এক তরুণ তার তালতো বোনকে নিয়ে এমসি কলেজের বাংলোর পেছনে গিয়ে বসে। এমন সময় সাইফুর চক্রের সদস্যরা তাদের পায়। এক পর্যায়ে অসামাজিক কাজের অভিযোগ তুলে তারা ওই তরুণ-তরুণীর ছবি তুলে। এরপর ছেলেটিকে বেঁধে তরুণীকে গণধর্ষণ করে। টাকাও চায় তরুণীর কাছে। খবর পেয়ে তিনি গিয়ে ওই তরুণী ও ছেলে বন্ধুকে উদ্ধার করলেও কাউকে খুঁজে পাননি। এ ঘটনার পর নির্যাতিত কিংবা সঙ্গে থাকা ছেলেটি আইনি ঝামেলা এড়াতে মামলায় যায়নি বলে জানান বাবলা।
এদিকে- শুধু এই ঘটনাই নয়, খোদ এমসি কলেজের ভেতরে এ ধরনের বহু ঘটনা ঘটেছে বলে জানান স্থানীয়রা। এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে এমসি কলেজের গার্ড মাইকেলকে ক্যাম্পাসেই গণধোলাই দেয়া হয়েছিলো। স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে তাকে গণধোলাই দেয়। সাইফুর-রনি সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতো বলে জানা যায় মাইকেল। কেউ ক্যাম্পাসে গেলেই মাইকেল খবর দিতো ওই সিন্ডিকেটকে। মন্দিরের টিলার ঢালু জায়গাতে আড্ডাস্থল সাইফুর, রনি, রবিউলদের। স্থানীয়রা জানায়- বিকাল হলেই ধান্ধায় বের হতো তারা। চলে আসতো ওখানে। প্রতিদিনই মন্দিরের টিলায় ঘুরতে যায় তরুণ-তরুণীরা। আর তাদেরই টার্গেট করে ওরা। তাদের হাতে সম্ভ্রম হারানো অনেক নারী বিচার না দিয়েই চলে যান।

স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন- এমসি কলেজের ক্যাম্পাস ছিল ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা। তাদের কাছে অসহায় ছিল কলেজ প্রশাসনও। তিনি দাবি করেন- গত ৫ বছরে ক্যাম্পাসের পেছনের টিলায় অন্তত ১০টির মতো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনাই প্রশাসন জানতেন। কিন্তু তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন না। ওদের কাছে জিম্মিই ছিল কলেজ প্রশাসন। বরং খাদিজার ঘটনার পর থেকে প্রশাসন জানতো ছাত্রলীগ কর্মীরা ক্যাম্পাসকে নিরাপদ রাখছে। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের আগে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন নিতাই চন্দ্র চন্দ। সাবেক অধ্যক্ষের কাছে সাইফুর-শাহ রনি ও রবিউল সিন্ডিকেটরা তার কাছে হোস্টেলে বসবাসকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর বেতন ও খাওয়ার বিল মওকুফের দাবি জানান। এতে কলেজ অধ্যক্ষ অস্বীকৃতি জানালে তারা অধ্যক্ষের কক্ষ ভাঙচুর করে। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ দায়িত্ব গ্রহণের পরও নানা ভাবে তারা প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণে কলেজ অধ্যক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন- তিনি অসহায় ছিলেন। এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গত শুক্রবার রাতে ধর্ষণ ঘটনার আগে ছাত্রলীগ কর্মীরা এমসি কলেজের ক্যাম্পাসে ছিল। সন্ধ্যা নামার পরপরই তারা চলে আসে কলেজের ফটকে। এ সময় সেখানে স্ত্রীসহ আসেন ওই স্বামী। কলেজ ক্যাম্পাসের ফটক থেকেই স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর ধর্ষণের পর তারা গাড়ির চাবি ও মোবাইল ফোন রেখে দেয়। তার পরিবর্তে তারা দাবি করেছিলো ৫০ হাজার টাকা। ঘটনার পরপরই সেখানে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা গিয়ে গাড়ির চাবি ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। ওই ছাত্রলীগ নেতা জানান- সাইফুর চক্রের কাজই হচ্ছে, বেড়াতে আসা পুরুষকে বেঁধে নারীদের ধর্ষণ করা। এরপর তারা মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। গত শুক্রবারের ঘটনায়ও তারা একই কাজ করেছে।

নির্জন, নিরিবিলি টিলায় গেলেই ওই এলাকায় একটি চক্র তাদের একইভাবে ব্ল্যাকমেইল ও ধর্ষণ করতো। এ ধরনের অনেক ঘটনা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে রটছে। তারা জানান- বেশির ভাগ সময় প্রেমিক-প্রেমিকা টিলায় বেড়াতে আসেন। তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ছাত্রলীগের বালুচরের একদল কর্মী। এসব কর্মীদের পুলিশে নানা সময় অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ জানিয়েছেন- এমসি কলেজ কিংবা আশপাশের এলাকাকে নিরাপদ করতে একটি থানার প্রস্তাব রয়েছে। হযরত শাহ বোরহান উদ্দিনের নামে ওই থানা করার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। থানা হলে, পুলিশি টহল বাড়বে ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা কমে যাবে। তিনি জানান- এমসি কলেজ ও আশেপাশে এলাকায় জোরপূর্বক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির অনেক ঘটনা তার কাছে আগেও এসেছে। কিন্তু পরিচয় না পাওয়ায় কোনো প্রতিকার করা সম্ভব হয়নি। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন- এমসি কলেজ ও আশেপাশের এলাকায় সব সময় পুলিশ টহল ছিল। এখনো আছে। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ধর্ষক ও আসামিদের বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন ঘটনায় মামলা ছিল বলে জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *