কর্ণফুলি টানেল : আরও একটি স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ

Chattala24
  • 40
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    40
    Shares

(দ্রুতই এগোচ্ছে টানেল নির্মাণকাজ, ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে প্রকল্পের ৫৯ ভাগ কাজ) 

দেশ বিদেশের কতশত পণ্যবাহী জাহাজ ছুটে চলছে কর্ণফুলির বুকে। আবার এর নিচে নদীর তলদেশে চলবে শত শত গাড়ি। তাতে শিল্পায়ন ও পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি বিদু্যৎ মহাপরিকল্পনা, এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর, পূর্বমুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ শত পরিকল্পনা। ক’দিন আগেও এসব ছিল স্বপ্নের মতোই, যা এখন বাস্তবতার দ্বারপ্রান্তে।

করোনা ধাক্কা সামলে দ্রুতই এগোচ্ছে কর্ণফুলীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণ কাজ। এর মধ্যে শেষ হয়েছে প্রকল্পের ৫৯ ভাগ কাজ। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এই টানেলটির একটি টিউব এরই মধ্যে নদীর তলদেশ ছুঁয়ে অন্য প্রান্তে গিয়ে উঠেছে। আগামী এক মাসের মধ্যে অন্য টিউবটির খনন কাজ শুরু করতে এখন নদীপাড়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। টানেলের পাশাপাশি সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করতেও চলছে জোরাল চেষ্টা।

দুটি আলাদা টিউব বা সুরঙ্গের মাধ্যমে তৈরি হবে বহু আকাঙ্খিত টানেল। একেকটি সুরঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে ২ হাজার ৪৫০ মিটার। টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার বা ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় হবে ৪ দশমিক ৮ মিটার বা প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর ওপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে হবে একটি সার্ভিস টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যেকোনো বড় যানবাহন দ্রম্নত স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে। নেভাল একাডেমি প্রান্ত থেকে এরকম একটি সুরঙ্গ মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে আনোয়ারা প্রান্তে উঠে গেছে।
টানেল প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশীদ চৌধুরী জানান, কাজ বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। এর মধ্যে প্রকল্পের ৫৯ ভাগ কাজ শেষ। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে বা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অপর সুরঙ্গটির খনন কাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এর মাধ্যমে আমরা কাজের শেষ ধাপে পৌঁছে যাব।
২০১৭ সালে শুরু হয় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ কাজ। ২০২২ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে টানেলের সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইয়ের টেন্ডারের তুলনামূলক
বিবরণী পাঠানো হয়েছে। টানেল ও সংযোগ সড়কটি নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব কমবে ৫০ কিলোমিটার আর চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব কমে যাবে ১৫ কিলোমিটার। টানেল চালুর প্রথম বছর ৬৩ লাখ গাড়ি নদীর তলদেশ দিয়ে চলাচল করবে। একসময় এর পরিমাণ এক কোটি ৪০ লাখে গিয়ে ঠেকবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, এক মাসের মধ্যে তুলনামূলক বিবরণীর কাজ শেষ করে সংযোগ সড়কের মূল কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছি। শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে আনোয়ারা কালাবিবিরদীঘি পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের কাজে ব্যয় হবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলী মোহনায় দেশ-বিদেশের বড় বড় জাহাজের আসা-যাওয়ার মধ্যেই চলছে টানেলের কাজ। নদীর উত্তাল তরঙ্গ দেখে কারও বোঝার কোনো সুযোগ নেই যে, তলদেশে এত বড় কর্মযজ্ঞ চলছে। টানেল বোরিং মেশিন (টিভিএম) নামে একটি খননযন্ত্রের মাধ্যমে রাতদিন চলছে খনন কাজ। করোনার শুরুতে প্রকল্পের কাজ কিছুটা শ্লথ হলেও একদিনের জন্যও কাজ বন্ধ ছিল না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, টিভিএমের মাধ্যমে খননের পরপরই পেছন দিক থেকে সিগমেন্ট ঢুকে সুরঙ্গে পাকা দেয়াল তৈরি করা হয়। টিভিএম মেশিনের পেছন থেকে কংক্রিটের সেগমেন্টগুলো রেল ট্রাকের মাধ্যমে ঢোকানো হয়। এগুলো আটটি ভাগে ভাগ হয়ে রিং আকারে একটির সঙ্গে অন্যটি লেগে দেয়াল করা হয়। প্রতি ৮টি সেগমেন্টে দুই মিটারের একটি রিং তৈরি হয়। খনন আর সেগমেন্ট বানানোর সব কাজই হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। পুরো টানেল নির্মাণে ১৯ হাজার ৪৮৮টি সেগমেন্ট লাগবে বলে জানা গেছে। একেকটি রিং সেগমেন্টের ওজন প্রায় ১৩ টন। এসব রিং সেগমেন্ট তৈরি হচ্ছে চীনের চেন চিয়াং শহরে। সেখান থেকে ভালোভাবে প্যাকিং করে জাহাজে করে বাংলাদেশে আনা হয়।
সূত্র জানায়, করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে অর্থাৎ মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে অগ্রগতি হয় শতকরা ৫ ভাগ। প্রায় ১০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ টানেল চীনের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে চীনা সহায়তা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)।
ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেকরা বলেন, এই টানেল শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেলই নয়, এর মধ্যে নতুন দিনের সূচনাও হবে। চীনের সাংহাইয়ের মতো ওয়ান সিটি টু টাউন, নদীর অন্য প্রান্তে বন্দর সম্প্রসারণ, গভীর সমুদ্র বন্দর, পর্যটন সম্ভাবনার বিকাশ সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হবে এই টানেল। টানেলটি ঘিরে এর মধ্যে নদীর অন্য প্রান্তে ৭৮১ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে চায়না ইকোনমিক জোন। পরিসর ও শিল্পকারখানা বাড়ছে কোরিয়ান ইপিজেডে। এর পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *