চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের জ্বালানি চুরির গোমর ফাঁস

Chattala24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চসিক এর জ্বালানি ব্যবহার হয় নিজস্ব পেট্রোল পাম্প থেকে। যেখানে গত জুলাই মাসেও দৈনিক ৭ হাজার ১৫০ লিটার ডিজেল ব্যবহারের তথ্য রয়েছে দাপ্তরিক নথিতে। কিন্তু আগস্ট মাসে প্রশাসক নিয়োগ হওয়ার পর এ তথ্যে বড় ধরণের ফাঁক বুঝতে পারেন খোরশেদ আলম সুজন।

                                      সেই সঙ্গে চসিকের অ্যাম্বুলেন্স চালকের তেল চুরির ঘটনা ধরা পড়ে তার কাছে। ফলে জ্বালানি তেল ব্যবহারের ফাঁক বের করতে বেসরকারি একটি পেট্রোলপাম্প থেকে সাত দিনের জন্য জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা হয়। আর এতেই তেল চুরির গোমর ফাঁস হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও উঠে আসে তেল চুরির চিত্র।

চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এ প্রসঙ্গে বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এখনো অফিসিয়ালি প্রকাশ করা হয়নি। আনঅফিসিয়ালি জানতে পেরেছি, তেল চুরির ভালো ফাঁক ধরা পড়েছে। যেখানে দৈনিক ১৭০ লিটার পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, গত ২৪শে আগস্ট জ্বালানি তেল সংগ্রহ বিতরণ যাচাই-বাছাইয়ে চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-৩ কামরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিবেদনটি গতকাল প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে উপস্থাপন করে কমিটি।

                            প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত জুলাই মাসে চসিকে দৈনিক ৭ হাজার ১৫০লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। কিন্তু আগষ্ট মাসে দৈনিক ব্যবহার হয়েছে ৬ হাজার ৯৮০ লিটার তেল। যা আগের তুলনায় ১৭০ লিটার কম। এই তেলের বাজারমূল্য প্রায় আট হাজার টাকা। এভাবে প্রতিমাসে প্রায় আড়াই লাখ টাকার জ্বালানি চুরি করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনটিতে ৩৩টি পর্যবেক্ষণসহ জ্বালানি সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় ৩১টি সুপারিশ করেছে। পর্যবেক্ষণগুলোতে চসিকের নিজস্ব পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি বিতরণের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে চার হাজার লিটার ডিজেলের ব্যবহার নিয়ে আপত্তি করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক কামরুল ইসলাম বলেন, জুলাই মাসে ১০ ধাপে ইস্যু করা ৩৮৯ লিটার জ্বালানি ব্যবহার সুনির্দিষ্ট কোন যন্ত্রপাতিতে হয়েছে তার উল্লেখ না করে অন্যান্য খাতে দেখানো হয়েছে। প্ল্যান্ট জেনারেটর-৬ এ লোডশেডিংয়ের জন্য ৩ হাজার ৩৩০ লিটার ডিজেল ব্যবহার দেখানো হলেও সময় উল্লেখ নাই। প্ল্যান্ট জেনারেটর-৫এ ৩দিনে ৩০০ লিটার জ্বালানি লোডশেডিংয়ের নামে ইস্যু হলেও সময় উল্লেখ নাই এবং লগ বইয়ের সঙ্গে মিল নাই।

এছাড়া অ্যাসপল্ট প্ল্যান্টের লগ বইয়ে গত ১২ই জুন থেকে ১৮ই জুলাই পর্যন্ত অপারেটরের নাম এবং স্বাক্ষরের নিচে সিল নাই। এমনকি বিভিন্ন তারিখে কি কারণে জ্বালানি ব্যবহার হয়েছে তাও উল্লেখ নেই। লগ বইয়ে উল্লেখিত জ্বালানির পরিমাণের কলামে পূর্বজমা, সরবরাহ, খরচ এবং মজুদ প্রতিদিন একই পরিমাণ ছিল। এছাড়া অবিশ্বাস্যভাবে কন্টেনার মুভার, লং বুম স্কেভেটর-৩ ও ৫ এর কোন কোন ড্রাইভার এককভাবে ১৬-১৭ ঘণ্টা যান ব্যবহার উল্লেখ করা হয়েছে লগ বইয়ে। পে লোডার-১৩ সহ অন্যান্য যান ও যন্ত্রপাতি একই দিনে দুইজন ড্রাইভার দ্বারা চালানো হলেও তাদের যান গ্রহণ ও প্রদানের সময় সংরক্ষিত নাই। এমনকি এ বিষয়ে লগ বইয়ে একই পৃষ্ঠায় ব্যবহৃত যানের বর্ণনায় সময়ও উল্লেখ নাই।
প্ল্যান্টের অধীন ব্যবহৃত জেনারেটর-৫ পর্যবেক্ষণে তদন্ত কমিটি কি কাজে এর ব্যবহার হয়েছে তা জানতে পারেন নি। প্রাইভেট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্পোরেশন থেকে পানির গাড়ির ব্যবহারের ক্ষেত্রে পানির গাড়ি বা পানির পরিমাণের উল্লেখ করে কোনো প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পর্যন্ত না থাকার উল্লেখ করা হয়।

জ্বালানি সংগ্রহের প্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ফিলিং স্টেশনের এরিয়া অরক্ষিত, ট্যাংকের জ্বালানি ধারণক্ষমতার কোনো প্রদর্শনযোগ্য বোর্ড নাই, অয়েল ট্যাংকার ২০ বছর পূর্বের, নিরাপত্তার জন্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও তা মেয়াদোর্ত্তীর্ণ, নথি ও ইস্যু স্লিপ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত জায়গা ও আসবাবপত্র নাই। নির্দিষ্ট সময় পর রিজার্ভ ব্যাংক পরিষ্কার না করায় তেলের বিশুদ্ধতা নষ্ট ও গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতির আশঙ্কাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৬ই আগস্ট চসিক প্রশাসকের দায়িত্ব বুঝে নেন খোরশেদ আলম সুজন। পরেরদিন ৭ই আগস্ট চসিক পরিচালিত একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে তেল চুরির বেশ কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে কাজলচন্দ্র সেন নামে ওই চালককে বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনার পর সামনে আসে জ্বালানি খাতে অনিয়মের বিষয়টি।
চসিকের যান্ত্রিক শাখার তথ্যানুযায়ী, মেঘনা পেট্টোলিয়াম থেকে সংগ্রহ করা জ্বালানি নিজস্ব ফিলিং স্টেশন থেকে নিজস্ব যানবাহনের জন্য ইস্যুকৃত স্লিপের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। সংস্থাটিতে বর্তমানে ৪১৪টি সচল যান ও ২৫টি জেনারেটর রয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ২২ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৯ টাকা এসব যানে জ্বালানি খাতে খরচ হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *