ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়লেও কমেনি সোর্সের দৌরাত্ম্য

Chattala24
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

সাইবার জগৎ থেকে দুর্গম কিংবা নিঝুম স্থানে নিরাপত্তা এবং নজরদারিতেও প্রযুক্তির নতুন নতুন সংযোজন ঘটছে পুলিশে। খুনি, জঙ্গি থেকে ছিঁচকে চোর ধরতে পুলিশ প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছে। রাজধানীসহ মহানগর পর্যায়ে প্রযুক্তিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করে আগের সেই ম্যানুয়াল সোর্সদের ওপর নির্ভরতা তেমন কমেনি, যেকারণে সোর্সদের দৌরাত্ম্য এখনও রমরমা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিস্তর অভিযোগের পরও প্রযুক্তির যুগেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিতর্কিত এই ‘সোর্স’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘ফর্মা’ কালচার। মাঠ পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে ভয়ঙ্কর এসব সোর্স মাদক কারবার, ফুটপাতে চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এদের অনেকের নামে রয়েছে পুরনো মামলা। অপরাধ সম্পর্কে জানতে, অপরাধী ধরতে ও তদন্তে তথ্য সংগ্রহ করতে ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার’ এই পুরনো কৌশল বেশির ভাগ থানা এলাকায় এখনো চলমান।

সোর্সরা কোনো বাহিনীর স্বীকৃত সদস্য নয়; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে সোর্স নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কর্মকাণ্ডে গোপন তথ্য দেওয়া, দাগী অপরাধীদের শনাক্ত করাসহ নানা কাজে সোর্সদের সহায়তা খুবই জরুরি।
তবে সোর্সদের দৌরাত্ম্যে অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি সহ অন্যান্য অপরাধ-অপকর্মেও অপ্রতিরোধ্য তারা। তাদের অতি বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে প্রায়ই পুলিশ কর্মকর্তারা বিপাকে পড়েন।

সিএমপির কয়েকটি থানায় সোর্সরাই হয়ে উঠেছে সর্বেসর্বা, মূর্তিমান আতঙ্ক। সম্প্রতি নগরীর ডবলমুরিং থানাধিন এলাকায় তিনটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশ সোর্সদের সরাসরি জড়িত থাকার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় সিএমপি জুড়ে। এছাড়া চকবাজার, চান্দগাঁও, বাকলিয়া থানাসহ নগরীর আরও বেশ কয়েকটি থানায় এই সোর্সদের দৌরাত্ম্যে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

গত রোববার (২৭শে সেপ্টেম্বর) বোনের বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গিয়ে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং এলাকার সুপারিওয়ালাপাড়ায় এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। যাদের মধ্যে প্রধান আসামি চান্দু মিয়া ‘পুলিশের সোর্স’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। এই পরিচয় ভাঙিয়ে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, নিরীহ লোকজনকে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়, নারীদের যৌন হয়রানি করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ইতিমধ্যে চান্দু কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় রীতিমতো ত্রাস ছিল চান্দু। তার অত্যাচার ও অপকর্মে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হলেও ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পেতেন না। কারণ তার ওপরে আশীর্বাদ ছিল ডবলমুরিং থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের। আবার ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবও খাটাতো চান্দু। ডবলমুরিং থানা ছাত্রলীগের বিতর্কিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদের আপন চাচাতো ভাই এই চান্দু মিয়া। চান্দু তার সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক মিছিলেও অংশ নিতো বলে জানা গেছে স্থানীয় সূত্রে।

এদিকে একই থানা এলাকায় গত ৪ সেপ্টেম্বর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন আইয়ুব আলী নামে এক ড্রাইভার। তিনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বেড়াতে এসেছিলেন। ঘটনার দিন রিক্সাযোগে লালখান বাজার থেকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে বারিক বিল্ডিংয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে প্রকাশ্য সড়কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় আটক হয় পাঁচজন। এদের মধ্যে বাবু নামে এক আসামি সদরঘাট থানা পুলিশের ‘সোর্স’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
কথিত এই সোর্সের বিরুদ্ধে মানুষের গাড়ি-অফিসে বা ঘরে মাদক রেখে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করানোর অভিযোগ রয়েছে। পরে নগদ টাকায় রফাদফা করা হতো থানায়। পুলিশের অভিযানে উদ্ধার করা মাদকদ্রব্য আবার এই ‘সোর্স’ বাবুর মাধ্যমে বিক্রি করা হতো এমন অভিযোগের কথাও জানা গেছে একাধিক সূত্রে।
নগরীর চকবাজার থানা পুলিশের কথিত দুই সোর্সের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। আলোচিত এই দুই সোর্স নাছির উদ্দিন ওরফে ল্যাডা নাছির ও সেকান্দর। নাছির একসময় শিবিরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ছিল। ফটিকছড়িতে নিজের মাকে হত্যাসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত নাছির বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ছিল চকবাজার এলাকার ত্রাস। পুলিশের করা শিবির ক্যাডারদের তালিকায় প্রথমেই তার নাম থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ ‘পুলিশের সোর্স’ হিসেবে আবির্ভাব ঘটে নাছিরের। মূলত গ্রেফতার এড়াতেই সোর্স হিসেবে কাজ করছে নাছির— এমন তথ্য জানিয়েছে চকবাজার থানার একটি সূত্র।

পুলিশের সহায়তায় নিরীহ লোকজনকে ফাসিয়ে অর্থ আদায়, মাদক ও জুয়ার স্পটগুলো থেকে পুলিশের নামে মাসোহারা আদায় করে যাচ্ছে কথিত এই দুই সোর্স। থানায় আসা ভুক্তভোগীদের থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে। চকবাজার এলাকায় তাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্র সক্রিয়। তারা এমনই বেপরোয়া যে, এমনকি থানা ফটকের ভেতর ও বাইরে ইয়াবাও বিক্রি করে কথিত দুই সোর্স নাছির ও সেকান্দর। প্রায়ই পুলিশের সঙ্গে বাইকে তাকে চলাফেরা করতে দেখা যায়। বুধবারও (৩০ সেপ্টেম্বর) নাছিরকে চকবাজার থানার একজন এএসআই সঙ্গে তার বাইকে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান। অথচ এই নাছিরের বিরুদ্ধে রয়েছে হত্যা, অস্ত্র, বিস্ফোরক ছাড়াও আরও কিছু মামলা।
জানা গেছে, সেকান্দরের বিরুদ্ধে তিন পুলিশ কর্মকর্তাসহ চান্দগাঁও থানা এলাকায় গিয়ে এক বিউটিশিয়ানকে তুলে নিয়ে ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে গত জানুয়ারি মাসে। তাদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ওই বিউটিশিয়ান পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার এ ঘটনায় পুলিশের দুই এসআইকে ক্লোজ করা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাত নয়টার দিকে চকবাজার থানার পুলিশ ক্যান্টিনে দেখা গেছে সেকান্দর ও নাছির নামের এই দুই সোর্সকে। তাদের সঙ্গে এক পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন।
চকবাজারের পুলিশের আরেক সোর্স আক্কাস। চকবাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশের পক্ষ হয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করাই তার মূল কাজ। কয়েক বছর আগে চকবাজারের ক্ষুব্ধ মানুষ কথিত এই সোর্স আক্কাসের কান কেটে দেয়। সেই থেকে তাকে ‘কানকাটা আক্কাস’ হিসেবেই স্থানীয়ভাবে সবাই চেনে। চকবাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আক্কাস মূলত র‌্যাব ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করেন। এক সময় চকসুপার মার্কেটে তিনি ভিডিও-সিডির দোকানে কাজ করতেন। সেই আক্কাস এখন পুলিশের সোর্স।
বহদ্দারহাট এলাকার দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী ও সবুর হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইমন বড়ুয়ার বাবা রঞ্জিত বড়ুয়া পুলিশের সোর্স হিসেবে নানা অপকর্মে জড়িত। ফুটপাতের দোকান, গাড়ি স্ট্যান্ড, মাদক কারবারি, জুয়ার আসর থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাত থেকে পুলিশের নামে মাসোহারা আদায় করার দায়িত্বে আছে কথিত সোর্স রঞ্জিত বড়ুয়া। চট্টগ্রামে পুলিশের সঙ্গে মিলে ইয়াবাসহ মাদক দিয়ে নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগও কম নয়। গত বছরের ১৫ মে জহিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর জানা যায়, ওই লোক পুলিশের কাছে গিয়ে পরিচয় দিতেন অন্য সংস্থার সোর্স হিসেবে এবং অন্য সংস্থার কাছে পরিচয় দিতেন পুলিশের সোর্স হিসেবে। এর আড়ালে লোকটি মূলত বিক্রি করতেন ইয়াবা। ঘুরেফিরে আলোচনায় থেকে যায় সোর্স।

 

1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *