স্বাস্থ্যের ড্রাইভারের সকল সুখের মূল উর্ধ্বতণ কানেকশন!

  |  শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০ |  ৫:১৯ অপরাহ্ণ

স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল- এই বাক্য আমরা ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি। কিন্তু  স্বাস্থ্যের ড্রাইভার মালেকের সকল সুখের মূলে উর্ধ্বতণ কানেকশন।

                          স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, পাজেরো গাড়ি দিয়ে মালেক নিজের ডেইরি ফার্মের দুধ নিয়ে আসতো। অফিসে ঢুকানোর আগে গাড়ি থেকে মালামাল নামিয়ে পরে অফিসে আসতো সে। এই ঘটনা অফিসের প্রায় সবাই জানে। কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। কারণ বড় কর্মকর্তাদের খুব কাছের মানুষ মালেক।

                      অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধুমাত্র মহাপরিচালকের গাড়িই নয়, আবদুল মালেক স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি পিকআপ (ঢাকা মেট্রো- ঠ- ১৩-৭০০১) নিজের গরুর খামারের দুধ বিক্রির কাজে ব্যবহার করে থাকেন। এই গাড়িটি চালায় মাহবুব নামে একজন চালক। এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি মাইক্রো (ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-৬৭৪১) পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যবহার করতেন আবদুল মালেক। এই গাড়িটিও কামরুল নামে একজন চালককে দিয়ে ব্যবহার করাতেন তিনি।

                            দুর্নীতি হচ্ছে, নিম্নপদস্থ একজনকে হয়তো ধরা হচ্ছে, তাকে নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনা করছি। কিন্তু, উচ্চপদস্থরাই থেকে যাচ্ছেন জবাবদিহিতার বাইরে।

                                      উচ্চপদস্থ কারও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া একজন নিম্নপদস্থ কখনোই দুর্নীতি করতে পারবে না। মামলা হলেও সেখানে উচ্চপদস্থদের বাদ দিয়ে নিম্নপদস্থের অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ফলে, এক বা একাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা চলে গেলেও তৈরি হচ্ছে আরও অনেকজন। যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি, তারা জবাবদিহি বা বিচারের আওতায় না আসায় এই ধারাবাহিকতাটা চলমান।

                          নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, এই ক্ষমতা নিয়েই তিনি অধিদফতরের চিকিৎসকদের বদলি, পদোন্নতি ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিল আবদুল মালেক। একজন পরিচালক তার বিরুদ্ধে অডিটের চেষ্টা করলে সেটিও তিনি করতে পারেননি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারণে। যে কারণে আবদুল মালেক কোন গাড়ি ব্যবহার করতো, কীভাবে তেল খরচ করতো তা নিয়ে খুব একটা বেশি ভাবার অবকাশ ছিল না।

                                  তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের একটা বিশাল অংশ যারা এই স্বাস্থ্য অধিদফতরে কাজ করেন, তারা মূলত এই আবদুল মালেকদের সমীহ করেই চলে। কারণ শুধু শুধু ভেজালে পড়ার কোনো মানে হয় না। উনাদের কারো সঙ্গে যদি কোনো সমস্যা হয় তবে দেখা যায় যে, কিছুদিনের মধ্যে চিকিৎসকের বদলির আদেশ চলে আসে। এজন্যেই এই স্বাস্থ্য অধিদফতরে চিকিৎসকদের মাঝে একটা মজার গল্প প্রচলিত আছে। সেখানে আমরা বলি-চিকিৎসক না হয়ে হলাম না কেন মালেক! কারণ এখানে আসলে তাদেরই ক্ষমতাতেই সব চলে।

                       ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালকই না, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও যদি রাজধানীতে একাধিক বাড়িসহ অঢেল সম্পদের মালিক হতে দেখা যায় তবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। এই সম্পদ বৈধ কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায় যে, বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এসব ক্ষেত্রে। এখানে দুটি বিষয় আছে। প্রথমটি হলো- বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য সম্পদ আহরণ হলে সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। এই কাজটি দুর্নীতি দমন কমিশন খুব সহজভাবেই করতে পারে। ব্যক্তির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসেব নিলেই পরিষ্কারভাবে বের হয়ে আসবে যে, তিনি কীভাবে এই সম্পদের মালিক হয়েছেন। যদি সেক্ষেত্রে অবৈধ কিছু পাওয়া যায় তবে তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতি হচ্ছে, নিম্নপদস্থ একজনকে হয়তো ধরা হচ্ছে, তাকে নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক বা আলোচনা করছি। কিন্তু, উচ্চপদস্থরাই থেকে যাচ্ছেন জবাবদিহিতার বাইরে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত কাগজে-কলমে মালেক স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেনের গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু ডা. এনায়েত হোসেন বর্তমানে যে টয়োটা ভিগো (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৮-৩৯৫১) গাড়ি ব্যবহার করেন, সেটির চালক হারুন। এর আগে এনায়েত হোসেন যখন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ছিলেন, তখন তার গাড়ির চালক ছিলেন আবদুল মালেক। সেই সময় ডা. এনায়েত হোসেনের জন্য বরাদ্দ ছিল ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-২৯৭৯ নম্বর প্লেটের সাদা রঙের পাজেরো জিপ, যা চালাতেন মালেক। পরে ডা. এনায়েত মহাপরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পেলে নতুন গাড়ি ব্যবহার করতে থাকেন। ওই সময় থেকেই সাদা পাজেরো জিপটি ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আসছেন আবদুল মালেক, যার লগবুক বা চাবির কোনো তথ্য কেউই দিতে পারছেন না।