চট্টগ্রামের ৬ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, ভর্তি ফি লাগামহীন

  |  বৃহস্পতিবার, জুন ১০, ২০২১ |  ১২:৫২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত চট্টগ্রামের ৬টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে শুরু হয়েছে ভর্তিযুদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫শ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ৫ জুন থেকে ফরম বিতরণ শুরু হয়েছে। জমা দিতে হবে ১৫ জুনের মধ্যে। ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।

ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রাম (ইউএসটিসি) এর চিকিৎসা অনুষদ ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড হেলথ সায়েন্স-আইএএইচএস’র অধীনে প্রতি ব্যাচে ৭৫ জন দেশি ও ২৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম রয়েছে। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানে দেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি ফি নেওয়া হয় ১৮ লাখ টাকা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০ হাজার ইউএস ডলার। চলতি শিক্ষাবর্ষে ৩৪তম ব্যাচে ভর্তি কার্যক্রম চলছে বলে জানান আইএএইচএস এর অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এ এম এম এহতেশামুল হক।

চন্দনাইশের বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির নিয়ম রয়েছে ৯০ জন শিক্ষার্থীর। এবার ১৯তম ব্যাচে ভর্তি করা হবে। রয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, দরিদ্র ও মেধাবী কোটা। ভর্তি ফি ১৭ লাখ টাকা।

আগ্রাবাদের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজে ১৬তম ব্যাচে ১১০ জনকে ভর্তি করা হবে। এখানে ১৫টি আসনে ভর্তির জন্য মেধাবী ও অসচ্ছল, কলেজের গভর্নিং বডি এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা রয়েছে। ভর্তি ফি নেওয়া হচ্ছে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার সাউদার্ন মেডিক্যাল কলেজে ৬৫ জন, গরীব ও মেধাবী ৫ জন ও ২ জন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের জন্য কোটা সংরক্ষিত আছে। এই প্রতিষ্ঠানে গত বছর ভর্তি ফি নেওয়া হয় ১৬ লাখ টাকা। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জয়ব্রত দাশ জানান, এবার ১৬তম ব্যাচে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে।

বায়েজিদ বোস্তামি চন্দ্রনগর এলাকার মেরিন সিটি মেডিক্যাল কলেজে প্রতি ব্যাচে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এস এম আশরাফ আলী জানান, এখন ৮ম ব্যাচে ভর্তি চলছে। এখানে ভর্তি ফি নেওয়া হয় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৯ হাজার ইউএস ডলার। আর দেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ১৩ লাখ টাকা।

চান্দগাঁও শমসের পাড়া চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে (সিআইএমসি) ৮ম ব্যাচে ৫৫টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে বলে জানান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমির হোসেন। জানা গেছে, শিক্ষার্থীপ্রতি এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ফি নেওয়া হয় ১৮ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ এর কম নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীরা বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না। একই নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলও (বিএমডিসি)। এতে বলা হয়, প্রতিটি বেসরকারি মেডিক্যাল বা ডেন্টাল কলেজ ও ইনস্টিটিউটকে অবশ্যই মেধাক্রম অনুসারে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে।

যদিও অতীতে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের ১২ জন এবং ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ৪৮ জন শিক্ষার্থীর ভর্তিতে অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য পায়। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে মেধা তালিকার ক্রম ডিঙিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং অন্যান্য বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে মেধাবী ও অসচ্ছল কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিদেশি কোটায় দেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগ ওঠে। নির্দিষ্ট আসনের অতিরিক্ত শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হয়েছে ২০-৩০ লাখ টাকায়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত ৩ মে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন, ২০২১ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। এ আইনের অধীনে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, প্রত্যেকটি মেডিক্যাল বা ডেন্টাল কলেজে কমপক্ষে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে চিকিৎসা শিক্ষা-১ শাখা এর আগে ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে বেসরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে এমবিবিএস-বিডিএস কোর্সে ১ম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি ফি নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ভর্তি ফি ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ইন্টার্নী ভাতা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, পাঁচ বছরে টিউশন ফি প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা করে ৬০ মাসে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সহ সর্বমোট ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

ক্যাম্পাসের উন্নয়ন, টিউশন, অধিভুক্তি ফি, বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রেশন, বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন, মার্কশিট যাচাই, কেন্দ্র ফি, কলেজ ম্যাগাজিন ফি, গেমস, স্পোর্টস ও অন্যান্য বিনোদন ফি, পরিচয়পত্র, লাইব্রেরি ফি, সেশন ফি, জেনারেল ল্যাব ফি, কম্পিউটার ল্যাব, আবাসিক সুবিধা, থাকা-খাওয়া বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসব টাকা আদায় করা হয়।

চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে বর্তমানে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে শেষ বর্ষে পাস করে বের হওয়া পর্যন্ত ৪০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। এত টাকা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। একেক কলেজে একেক অঙ্কের ভর্তি ফি চায়। ফলে শেষ পর্যন্ত অনেক কলেজে কিছু আসন খালি থাকে। বলতে গেলে দেশের বেসরকারি মেডিক্যাল শিক্ষা একপ্রকার ধনী শ্রেণির শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী পায়নি।

দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে যোগ্য বিবেচিত হন ৪৮ হাজার ৯৭৫ জন। এদের মধ্যে প্রথম ৪ হাজার ৩৫০ জনকে ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তির জন্য নির্বাচিত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এছাড়া ৭০টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে আরও ৮ হাজার ৩৪০ জন ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ১০ হাজার ৫১৭ জন পরীক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল।

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ) এর এক কর্মকর্তা জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। এটা উদ্বেগজনক। তবে গত বছরের মতো এবারও একই ভর্তি ফি গ্রহণ করা হবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ নম্বরের বেশি পেয়ে পাস করেছে তারাই ডাক্তারি পড়তে আবেদন করছে। কিন্তু বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে লাগামহীন ভর্তি ফি দিয়ে পড়ার মতো ক্ষমতা অনেকেরই নেই। এসব মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। কোন কলেজ কিভাবে কত টাকা ভর্তি ফি নেয়- সেটাও পর্যবেক্ষণে রাখা দরকার।