চার বছর ধরে ঘরের বাইরে শিকলে বাঁধা মেহেদি

যাপন করছেন মানবেতর জীবন

 বিপ্লব তালুকদার, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি |  Sunday, June 13th, 2021 |  9:49 pm

জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর রোদে আকাশের নীচে বসে আছে সুদর্শন তরুণ মেহেদি হাসান। পুকুরের পাড়ে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রাত দিন পার করছেন তিনি। বাম পায়ে লোহার শিকলে তালা পড়ানো তার। শিকল বাঁধা অবস্থায় এভাবেই ঝড়, তুফান, বৃষ্টির মাঝেও খোলা আকাশের নীচে জীবন যাপন করছেন তিনি। বৈরি আবহাওয়াতেও ঘরে ঠাঁই হয় না মেহেদীর। এমনকি পুকুরপাড়ে নেই কোন ছাউনি, ঘুমানোর জন্য নেই খাট।

মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর চার বছর ধরে এভাবেই মানবেতর জীবন কাটছে তাঁর। মেহেদি হাসানের বয়স এখন ২৮। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে মহালছড়ি উপজেলা সদরের মোহাম্মদপুর এলাকায় পুকুর পাড়ে মেহেদি হাসানের পরিবারের বসবাস ছিল। তার পিতা কেনান মিয়া একজন দিনমজুর। মা বকুল খাতুনও প্রায় ১৪ বছর ধরে মানসিক প্রতিবন্ধী। অষ্টম শ্রেনীতে পড়ার সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন মেহেদি হাসান। স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে হতদরিদ্রে পরিনত হয়েছে কেনান মিয়া।

মেহেদি হাসানের মামা মো. শাহেদুল ইসলাম জানান ,‘আমার ভাগিনা হঠাৎ করে ক্লাস এইটে পড়ার সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। আর্থিক সার্মথ্য অনুযায়ী চিকিৎসা করানোর পর সুস্থ হয়নি। ৪ বছর ধরে এভাবেই পুকুর পাড়ে জীবন পার করেছে। কোন সহযোগিতা আমরা পাইনি। আমার ভাগিনা ও বোনের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পুরো পরিবার এখন নিঃস্ব। তাদের মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই নেই। তিনি আরো বলেন,‘ শিকল খুলে দিলে মানুষের সাথে মারামারি করে। এর আগে বাজারে মারামারি করে দুজনের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়। এরপর লোকজন জোর করে তাকে লোহার শিকল পড়িয়ে দেয়। বৃষ্টিতেও এখানে ,তুফানেও এখানে ,রোদেও এই পুকুর পাড়ে থাকে সে। পুকুর পাড়ে টিনের ছাউনি ছিল, খাট ছিল সেগুলো সে পানিতে ফেলে দিয়েছে। এখন এভাবেই থাকছে।’

এসময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ সমাজসেবা অফিস আমাদেরকে কোন সহযোগিতা করেনি। একই পরিবারে মা ও ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী হলেও তারা কোনরকম সহযোগীতা ভাতার আওতায় আসেনি।’

মহালছড়ি তরুণ সংগঠক জিয়া জানান, ‘ সে অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত ভালো করেই পড়াশোনা করেছে। তাদের ঘরবাড়ি নেই। মা ও ছেলে দুজনই মানসিক প্রতিবন্ধী। তাদের চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। এ পর্যন্ত তারা কোন ভাতা পর্যন্ত পায়নি। সবার উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

মেহেদি হাসানের মামা মো.ইসমাইল বলেন, ‘ আমরাও আর্থিকভাবে তেমন সক্ষম না। সরকার তাদের পুর্নবাসন করার ব্যবস্থা করলে ভালো হত। হতদরিদ্র পরিবারটির পক্ষের মা ও ছেলের চিকিৎসা করানো সম্ভব না।’

মহালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রতন কুমার শীল জানান, ‘ সে তো প্রতিবন্ধী এবং কার্ড পাওয়ার যোগ্য । শীঘ্রই তাদের প্রতিবন্ধী কার্ড করার উদ্যোগ নেয়া হবে। ’

মহালছড়ি সমাজসেবা অফিসার মো.শামসুল হক জানান, ‘আমাদের প্রতিবন্ধী জরিপ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। প্রতিবন্ধী জরিপ কার্ড পূরণ করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় । চিকিৎসক দ্বারা প্রতিবন্ধী ক্যাটগরি অনুযায়ী অর্ন্তভুক্ত হওয়ার পর উপজেলা প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ কমিটি যাচাই বাছাই করে তাদেরকে ভাতার আওতায় আনা হবে।’

খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, ‘তাদেরকে দ্রুত রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিবন্ধী সুযোগ সুবিধার আওতায় আনা হবে। আমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে তাদেরকে সহায়তার উদ্যোগ নিব। ’