রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের আজ ৪ বছর; কাগজেই রয়ে গেছে সুপারিশগুলো!

 শহিদুল ইসলাম হৃদয়, রাঙামাটি প্রতিনিধি |  Sunday, June 13th, 2021 |  10:18 pm

প্রাকৃতিক দূর্যোগে পার্বত্য রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসের আজ চার বছর। ২০১৭ সালের (১৩ জুন) এইদিনে টানা প্রবল বর্ষনের ফলে পাহাড় ধসে সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্যসহ একশ ২০ জনের নির্মম মৃত্যু হয়েছিলো। সেদিনের স্বজন হারাদের আর্তনাদ থামেনি এখনো।

২০১৭ সালের ১৩ জুন শহরের মানিকছড়ি, শিমুলতলী, রূপনগর, আউলিয়া নগর, মুসলিম পাড়া, পোষ্ট অফিস কলোনী, নতুন পাড়া, লোকনাথ ব্রহ্মচারী মন্দির,সনাতন পাড়া, চেঙ্গীমুখ, পুরাতন বাস ষ্টেশন এলাকা, মাতৃমঙ্গল এলাকাসহ জেলার কয়েকটি উপজেলায় পাহাড় ধসে ১২০ জন মারা যায়। কিন্তু এসব স্থানে পাহাড় ধসে মারা যাওয়ার পরও লোকজন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। প্রবল বৃষ্টিপাতে আবারও পাহাড় ধসের ঝুকির সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বসবাসকারীরা জানিয়েছেন, ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করলেও তাদের অন্য কোথাও যাওয়ার স্থান নেই। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তাদের থাকতে হচ্ছে এখানেই।

এদিকে সেই ভয়াল দিন যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে জন্য ইতোমধ্যে শহরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ন স্থানে বসবাস ও বাড়ী-ঘর তৈরীর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ সাইন বোর্ড স্থাপন ও সচেতনা সৃষ্টির লক্ষে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। পাহাড় ধসের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইতোমধ্যে রাঙামাটি শহরে ঝুকিপূর্ন স্থানে বসবাস ও বাড়ী ঘর তৈরীর নিষেধাজ্ঞা জারিসহ সাইন বোর্ড স্থাপন ও সচেতনামূলক লিফলেট বিতরণ করেছে রাঙামাটির জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাঙামাটি শহরের ৩১টি স্থানকে ঝুকিপূর্ন স্থান হিসেবে চিহিৃত ও ২৯টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সেদিনের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘২০১৭ সালের ১৩ই জুন ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা রাঙামাটি পৌর এলাকায় সবচেয়ে বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভয়াল সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ন স্থানে বসবাসকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজগুলো করা হয়। পৌরবাসী এখন যথেষ্ট সচেতন হয়েছে। তবে পাহাড়ের ঢালুতে ঝুঁকি নিয়ে যে সমস্ত লোকজন বসবাস করেছিলো তারা বেশীর ভাগ নিরাপদ জায়গায় ফিরে গেছে।’

ফাইল ছবি

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ঝুকিপূর্ন এলাকাগুলো চিহিৃত করা হয়েছে ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা, উপজেলাগুলোতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা নিয়মিত করা, পৌরসভায় ওয়ার্ড ভিত্তিক রেসপন টিম গঠন করে তাদের তালিকা ও মোবাইল নাম্বর জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পদক্ষেপ, দূর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী মজুদসহ সার্বিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

২০১৭ সালের বর্ষায় এক রাতেই জেলা জুড়ে পাহাড় ধসে প্রাণ যায় ১২০ জনের। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো হাজারো ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিকল হয়ে গিয়েছিলো। যা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে প্রথম। ২০১৮ সালে জেলার নানিয়াচরে পাহাড় ধসে প্রাণ যায় ১১ জনের এবং ২০১৯ সালে কাপ্তাই উপজেলায় পাহাড় ধসে প্রাণ হারায় আরও তিন জন।

ভয়াবহ পাহাড় ধসের সেদিনের ঘটনার পর পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয় কয়েকটি কমিটি করেছিল। এর কারণ অনুসন্ধানে এসব কমিটি কাজ করে। পাহাড় ধস বন্ধে কমিটিগুলোর প্রতিবেদনে অনেক সুপারিশও উঠে আসে। পাহাড় ধস বন্ধে সুপারিশগুলো এখনো দৃশ্যমান বাস্তবায়িত হয়নি বলে মৌখিকভাবে স্বীকার করলেও জনসম্মুখে এসে বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ের দায়িত্বশীল কেউই কোনো কথা বলেননি।

এদিকে, পাহাড় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং বন-জঙ্গল ও গাছ উজাড়ের কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ধসের ঘটনাগুলো ঘটছে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের গায়ে জন্মানো বন-জঙ্গল এবং গাছপালা এর অভ্যন্তরীণ বন্ধন শক্ত রাখে। কিন্তু কিছু লোভী মানুষরা অব্যাহতভাবে পাহাড় কাটছে। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষ বসতির প্রয়োজনেও পাহাড় কাটছে। এতেই পাহাড় ধ্বংসের পথ তৈরি হয়।