ঝুঁকি বাড়াচ্ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আয়ুহীন ৫০৫ টি সেতু

  |  রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২০ |  ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৯টি রেলপথে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে আয়ুহীন ৫০৫টি সেতু। এর মধ্যে ৪৮টি মেজর ও ৪৫১টি মাইনর সেতু রয়েছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে এসব সেতুতে ঘটেছে একাধিক বড় দুর্ঘটনাও। যার মধ্যে ২০১৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ কুশিয়ারার মধ্যস্থলের রেলসেতু ভেঙে দুইদিন রেল চলাচল বন্ধ ছিল। ২০১৭ সালের ৩০ শে মার্চ মাধবপুরের ইটাখলা রেলসেতু ভেঙে দুর্ঘটনায় পড়ে রেল। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ৫ দিন বন্ধ ছিল।

                      এসব দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রেলপথ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-কোচ চালানো, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়হীনতাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মূলত রেলওয়ে করুণ পরিস্থিতিতে পড়ে।

                  তবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সুবক্তগীন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু আমরা নিয়মিত তদারক করি। স্লিপার-ফিটিংসসহ নিয়মিত বিভিন্ন কাজও করা হয়।
সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া রেললাইনে ৫২টি সেতু স্লিপার ও ফিটিংসের কাজ করা হয় গত ডিসেম্বরের দিকে। ওই সময়ে ৫২ সেতুতে ৬৫ হাজার ক্লিপ লাগানো হয়।

                     তিনি বলেন, রেলযাত্রা নিরাপদ করতে বেশকিছু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলো পুনঃনির্মাণ ও পুনর্বাসনে দু’টি পৃথক প্রকল্পে ভাগ করা হয়েছে। এরমধ্যে মেজরগুলো গার্ডার সেতু, আর মাইনরগুলো বক্স কালভার্ট করা হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৮২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
সূত্রমতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে রয়েছে ১৬৪টি। এরমধ্যে ষোলশহর-নাজিরহাট রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৭৯টি। এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ১৯২৭-১৯৩০ সালের মধ্যে। এরমধ্যে ৪টি মেজর ও ৭৫টি মাইনর সেতু।

লাকসাম-নোয়াখালী রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৩৭টি। এরমধ্যে মেজর ২টি ও মাইনর ৩৫টি। এ সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯২-১৮৯৫ সালে। লাকসাম-চাঁদপুর রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৪৮টি। এরমধ্যে ৭টি মেজর ও ৪১টি মাইনর। এসব সেতু নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯২-১৮৯৫ সালে।
এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ২২টি মেজর ও ৭৬টি মাইনর। ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম সিলেট রুটে ৪৩টি মেজর ও ৫২টি মাইনর। ভৈরব-নরসিংদী সেকশনে ৪টি মেজর ও ২৪টি মাইনর, ভৈরব-আটারবাড়ি অংশে ১টি মেজর ও ১৭টি মাইনর, টঙ্গী-নরসিংদী অংশে ২টি মেজর ও ১৯টি মাইনর, টঙ্গী-শ্রীপুর অংশে ৪টি মেজর ও ৩৯টি মাইনর, শ্রীপুর-ময়মনসিংহ অংশে ৭টি মাইনর, আটারবাড়ি-ময়মনসিংহ অংশে ১টি মেজর ও ১০টি মাইনর এবং ময়মনসিংহ-গৌরীপুর অংশে ২টি মেজর ও ৮টি মাইনর সেতু ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।

                          এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এগুলোর উপর দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া এসব সেতুর এক্সেল লোড ধরা আছে মাত্র ১১.৬ টন। তবে নতুন প্রকল্পে ২৫ টন এক্সেল লোড ধরে সেতুগুলোর ডিজাইন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

                                রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সরদার সাহাদাত আলী বলেন, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশ রেলওয়েতে যেসব রেলসেতু রয়েছে তার অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে বৃটিশ শাসনামলে। এদের অনেকগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বহু বছর আগে। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ক্রমেই আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। অবশ্য ঝুঁকি এড়াতে শতবর্ষী এসব সেতুতে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত কাজও হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বেশকিছু রেল সেতু পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে বা চলমান আছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলো পুনঃনির্মাণে পৃথক দুটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটির যাচাই-বাছাই চলছে। এরপর প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। তারপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হতে আরো ৫-৭ বছর লাগতে পারে।