এক মুক্তিযোদ্ধার আকুতি

  |  বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ৩, ২০২০ |  ৬:০৪ অপরাহ্ণ

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ

৬৮ বছরের বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ চন্দ্র দাস সবার কাছে পরিচিত ‘গলেয়া দা’ হিসাবে। সম্ভ্রান্ত কোনো পরিবারের সদস্য কিংবা আহামরি শিক্ষিত না হয়েও শুধু দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রবল টানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি।

১৯৫২ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের দেবীগঞ্জ বাজারে জন্মগ্রহন করেন রমেশ চন্দ্র দাস। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জন্মের পরে বাবাকে হারিয়েছেন। মা অসুস্থ্য, বড় ভাইটিও ছিলেন প্রতিবন্ধি। ছিলো অভাবের সংসার। এক বেলা খেয়েই কোন মতো দিন পার করতেন। অর্থের অভাবে রোগ যন্ত্রণায় বিনা চিকিৎসায় মাকে হারিয়েছেন। কিন্তু শত বেদনার মাঝেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পিছু হাটেননি তিনি।

রাখালের কাজ করে এক বেলার আহার জোগাড় ও কষ্ট করে ৯ম শ্রেনী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন, পরে আর পড়তে পারেননি। এরপর মা হারানোর বেদনা ও প্রতিবন্ধী বড় ভাইকে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য আনসার কমান্ডার আব্দুর রহমানের সাথে চলে যান ভারতের থুকরাবাড়ি ক্যাম্পে। সেখানে প্রথমে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের পাটাপাড়ায় আসার সময় ইন্ডিয়ান আর্মি তাদেরকে আটক করে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। এরপর তাদের নাম খাতায় রেজুলেশন বহিতে লিখে নেওয়া হয়। তারপর তাদেরকে নিয়ে যায় মুজিব ক্যাম্পে। দীর্ঘ ২৮ দিন মুজিব ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে চলে যান মুক্তিযুদ্ধের ৬ নং সেক্টর চেংরা মাড়া টাউনের বুড়ি মাড়ি হাটে সেখানেই উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশারের অধিনে যুদ্ধে অংশগ্রহন করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনেন। জন্ম দেন এক নতুন রাষ্ট্রের।

দেশ স্বাধীনের পর ফিরে আসেন নিজ ভুমিতে। দেবীগঞ্জ বাজারের একটি ছোট সাইকেল মেকারের দোকান দেন। এরপর নতুন সংসার গড়েন। সেই সংসারে ২ মেয়ে আর ২ ছেলের জন্ম নেয়। দুই মেয়ের বিয়ে দিলেও বড় মেয়ের স্বামী একালপ্রয়াত হওয়ায় সে এখন বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন। আর বড় ছেলে বাস-রেলস্টেশনে কুলির কাজ করে সংসার চালান। ছোট ছেলে ডিগ্রী পাস করে চাকুরির জন্য দফতরে দফতরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে এখন ক্ষেত খামারে কাজ করেন। আর বাবা রাস্তায় ধারে বসে অন্যের বাইসাইকেল মেরামত করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ চন্দ্র বেশির ভাগ সময় থাকেন মুখ ভরা হাসি নিয়ে। স্থানীয়দের কাছে মানুষ হিসেবে অত্যন্ত রসিক এবং খোলা মনের, কারো কাছে তাঁর কোন চাওয়া কিংবা কারো প্রতি রাগ-অনুরাগ নেই তার। শুধু আছে অন্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্বাস, দেশপ্রেম, আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

জানা যায়, দীর্ঘ ৩০ বছর অপেক্ষার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া শুরু করলে তিনিও সেই ভাতা পান। প্রথম দিকে ৩শ থেকে এখন ১২ হাজার টাকা মাসিক মুক্তিযদ্ধা ভাতা উত্তোলন করেন। এবং বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাকে মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত অবদানের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসাবে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়।

আরও জানা যায়, ২০০২ সালে স্থানীয় বিএনপি নেতা শহিদুল রহমান স্ত্রী সেলিনা আক্তার জমি সংক্রান্ত বিষয়ে রমেশ চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। সেই মামলা চালাতে দীর্ঘ ১৮ বছর আদালত পাড়ায় দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে ঋণের দায়ে তিনি আজ সর্বশান্ত। স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে গেলেও কোন প্রতিকার না পেয়ে বরং উল্টো কথা শুনে অসহায়ের মতো ছলছল চোখে ফিরে আসেন। অবশেষে চলতি বছরে সেই মিথ্যা মামলা রায় বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ চন্দ্র দাসের পক্ষে আসে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ চন্দ্র দাস বলেন, যদি জানতাম মিথ্যা মামলার জন্য আমাকে ১৮ বছর কোর্টের বারান্দায় ঘুরাঘুরি করতে হবে তাহলে দেশের জন্য যুদ্ধ করতাম না। আমি ১৮ বছর খেয়ে না খেয়ে ঋণ করে মিথ্যা মামলা চালিয়েছি। আমার ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে। বাধ্য হয়ে এই বয়সে সাইকেলের মেকারি করে ছেলে মেয়ে মানুষ করতে হয়। কাকে কি বলব বলুন? আমার দুচোখের পানি শুকায় গেছে। ছোট ছেলেকে অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা শিখালাম যদি একটা চাকুরী পাই। আমার টাকা নাই তাই চাকুরীও নাই। তাই রাস্তায় বসে সাইকেল মেকারি করে মাহাজন শোধ করতেছি। যত দিন বেচে থাকবো মেকারি করে মাহাজন শোধ করব। কিন্তু আমি এই মামলাতেই মরে গেছি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ চন্দ্র দাসের মুখে শুনতে চাই তৎকালীন দেশের অবস্থার কথা। মুক্তিযুদ্ধের কথা আসতেই কাঁদতে শুরু করেন তিনি। কান্নাজনিত কণ্ঠে বলেন, শেখ মুজিবুরের কথা শুনলেই আমার কান্না আসে। উনি এমন একটা মানুষ ছিলেন ওনার আওয়াজ শুনলেই আমার বুক কেঁপে ওঠে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিবো, তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এই কথা গুলো শুনলে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যদি আমাকে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ও একটা ঘর নির্মাণ করে না দিতো তাহলে আজ আমাকে বউ বাচ্চা নিয়ে পথে বসতে হতো। শেখ হাসিনার প্রতি আমি খুবই খুশি। ভগবান যেন শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু দান করে। সব সময় সুস্থ্য থাকে ভগবানের কাছে এটাই আমার আবেদন।

বিজয়ের মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার আকুতি , আমি তো রাস্তায় বসে মেকারি করি। আমি আর কয়দিন বাঁচব। আমার একটা আবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার ছেলে গৌতম চন্দ্র দাসের যেন একটা চাকুরী দেয়। এটা শেখ হাসিনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি। আমার ছেলেকে যেন একটা চাকুরী দেয়।