চালু না হতেই চরম অনিয়মের অভিযোগ, পানির অভাবে যাত্রীরা বেহুশ

কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন রুটে চালু হওয়া ক্রুজশিপ বে-ওয়ান নিয়ে বইছে নিন্দার ঝড়

  |  সোমবার, ডিসেম্বর ২১, ২০২০ |  ৭:৫২ অপরাহ্ণ

কক্সবাজার প্রতিনিধি।।

শুরুতেই চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অতিথিদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে “বে ওয়ান জাহাজ” কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ চারদিকে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।

অতিথিদের অভিযোগ তাঁরা ঢাকঢোল পিটিয়ে যেভাবে এ বিলাসবহুল জাহাজের উদ্বোধন করেছে তা শুধু মাত্র লোক দেখানো। শুধু একটি পক্ষকে খুশি করার জন্য এই মঞ্চায়ন। না হয় শুরুতেই অতিথিদের সাথে এহেন অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অপমান করা হতো না। অনেকেই সেটাকে সুকৌশলে পরিকল্পিত অপমান বলেও গণ্য করছে। যার কারণে জাহাজ কর্তৃপক্ষের এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সইতে না পেরে জাহাজ থেকে তাদের আর্তনাদের কথা অনেকেই ফেসবুক লাইভে তুলে ধরে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে সাংবাদিক আবদুল্লাহ নয়ন তার ফেসবুকে লিখেন, “সম্মানিত মেহমানদের খাবারের আকুতি দেখে তিনবার লাইনে দাঁড়িয়েও সরে গিয়েছিলাম। বে ওয়ান ক্রুজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কিভাবে নিয়েছে জানিনা। তবে সকল মেহমানই যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে। তারা মেহমানদের ভাতে মেরেছে, পানিতে মেরেছে এবং নাস্তায়ও মেরেছে। সমস্ত কাজ ছিলো অগোছালো। সাংবাদিকদের সাথে আচরণও ছিল অপেশাদার”।

তারেকুর রহমান নামের আরেকজন গণমাধ্যম কর্মী তার ফেসবুকে লিখেন “৭৪ এর দুর্ভিক্ষ আরেকবার” ছবি দিয়ে শিরোনামে লিখেছেন – আমরা যারা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ দেখিনি, শুধু শুনেছি- খাবারের জন্য মানুষের হাহাকার, আকুতি-মিনতি এটির পুনরাবৃত্তি দেখলাম বে ওয়ান জাহাজে”।

আমিনুল ইসলাম নামের একজন গণমাধ্যম কর্মী লিখেছেন “বে-ওয়ান জাহাজ আজ ট্যুরিজম ব্যবসায় কালো অধ্যায় সৃষ্টি করল।আমি সাক্ষী ছিলাম, কতটা মূর্খতা ও পরিকল্পনাহীনতার পরিচয় বে- ওয়ান কর্তৃপক্ষ দিয়েছে”।

মোহাম্মদ নাজিম নামের একজন গণমাধ্যম কর্মী একই ভাবে তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, “ভাত নাই, আমি অসহায় ।  ভাত দে নয়ত চাল দে, রান্না করে খাবো”।

ওয়াহিদ রোবেল নামের অপর একজন গণমাধ্যম কর্মী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেন, “কি মন্তব্য করবো বুঝতে পারছি না। তবে এটি বলতে পারি আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচারণ করেলো জাহাজ কর্তৃপক্ষ। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে এধরনের আচরণ কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি অপারগ হলে তাদের আমন্ত্রণ করলেন কেন? নাকি পরিকল্পিতভাবে অপমান করার অপকৌশল ছিল আপনাদের” ? এভাবে অনেক অতিথিরা জাহাজ কর্তৃপক্ষের এহেন অসৈজন্যতা আচরণে বিভিন্নভাবে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে।

শুধু তাই নয় , জানা গেছে আমন্ত্রিত অতিথি তানভির পাশা ও দীপ্ত টিভি’র হারুনসহ অনেকই পানির অভাবেই বেহুশ হয়ে পড়েছিলো।

অতিথিদের অধিকাংশদের অভিযোগ, কক্সবাজার সদর থেকে কোন প্রকার নাস্তা বা পানির ব্যবস্থা না করে রাত ২ টা পর্যন্ত অভুক্ত রাখা হয়। আর কখনো আসব না বলে ক্ষমা চাইলেও এক গ্লাস পানিও তারা পান নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এছাড়া দাওয়াত দিয়ে এনে ভিআইপি বা শ্রেণি বিভাজন করেন তারা। মাত্র দুইটি ফ্লোর উন্মুক্ত রেখে বাকি গুলোকে দখলে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এতে চরম অসন্তোষ, ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেন আগত অতিথিরা। এসময় পানির অভাবেই অনেকেই বেহুশ ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

জানা যায়, আনুষ্ঠানিক সূচী অনুযায়ী দুপুর ৩টা ৩০ থেকে উদ্বোধনের পর সন্ধ্যায় কক্সবাজার পৌছার কথা ছিল। পাশাপাশি রাত ৯টায় খাবারের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু আমন্ত্রিত অতিথি ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস মিডিয়া, পত্র-পত্রিকার সংবাদ কর্মী সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিমন্ত্রিত অতিথিদের কোন প্রকার আপ্যায়ন এর ব্যবস্থা করা হয়নি। এছাড়া দুপুর থেকে বিভিন্ন অতিথিরা জাহাজে প্রবেশের পর থেকে এক গ্লাস পানিও পান নি। তাছাড়া সার্বক্ষণিক খাবারের ব্যবস্থা রাখার কথা বলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। কোন প্রকার আয়োজনের নিয়মকে তোয়াক্কা না করে যাচ্ছে-তা ব্যবহারে অতিথিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এছাড়া কক্সবাজার জেলা থেকে আমন্ত্রিত আমিনুল ইসলামসহ সাংবাদিকদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ বলেন, ‘এমন আয়োজন করে আমন্ত্রিত অতিথিদের অপমান করা হয়েছে। এছাড়া এটি একটি পুরাতন ও লক্কর ঝক্কর জাহাজকে মেরামত করে কক্সবাজার আনা হয়েছে।’

যদিও বা এসব অসৌজন্যতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র ফেইসবুক লাইভ ও ছবিতে  ভাইরাল হলেও জাহাজটির সমন্বয়ক বাহাদুর হোসেন উল্টো দায়সারাভাবে গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো। সাংবাদিকেরা গেনজাম বলে দম্ভোক্তি দেখিয়েছিলো।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা সভাপতি সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, জাহাজ টি সম্পূর্ণ অবৈধ। ২হাজার মানুষের ধারণ ক্ষমতার জাহাজটির বর্জ্য, মলত্যাগ ও পুড়া মুবিল ফেলে সাগর ভয়াবহ দুষিত করবে। এছাড়া জাহাজগুলোর প্রপেলারের আঘাতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র, ডলফিন, কচ্ছপ, কাকড়া ও ইলিশের প্রজনন নষ্ট করবে। এছাড়া প্রভাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন যে মুমূর্ষু অবস্থায় পরিণত হয়েছে এটি আরো বেশি পর্যটকের চাপে এ দ্বীপ একেবারে ধংস হয়ে যাবে। এছাড়া সরকার সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পরেও এই জাহাজগুলো চালু করা সেন্টমার্টিন ধ্বংস করার পায়তারা। সুতরাং পরিবেশগত বিষয়, সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় ও প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন রক্ষা এসব বিষয়গুলো বিবেচনা করে এসব অপরিকল্পিত জাহাজ বন্ধে সরকারের কাছে দাবী জানান তিনি।

কক্সবাজার পরিবেশ অদিপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মো: নাজমুর হুদা জানান, জাহাজটি চলাচলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র ও পরিবেশ যেন নষ্ট না হয় যেমন প্যাকেট, পলিথিন, বোতল, পণ্য, ক্যানসহ বিভিন্ন বর্জ্য তাঁরা সংরক্ষণ করছে কি না, তার মনিটরিং জোরদার করবে। এছাড়া দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এর জীববৈচিত্র রক্ষায় সরকারের যে নীতিমালা করেছে এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে।