বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস এসেছে হাত ধরাধরি করে

  |  রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১ |  ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
ভালোবাসা

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’- কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এমন প্রত্যয় নিয়ে বসন্তের অস্তিত্বকে জানান দিয়েছিলেন। ছয় ঋতুর বাংলাদেশে বসন্ত হলো শেষ ঋতু। প্রকৃতির ওপর ভর করে ষড়ঋতুর বাংলাদেশে সাধারণত প্রথম ঋতু গ্রীষ্মের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ এবং শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন বেশ আয়োজন-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে থাকে। করোনা অতিমারির কারণে গেলবারের পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন কেবল মনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, শুভেচ্ছার পরিধি ওই এসএমএস পর্যন্তই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আর বেশি কিছু সম্ভব ছিল না। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আমরা করোনার সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। তাই পহেলা ফাল্গুন উদ্যাপনের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু হবে না।

বসন্তে গাছে গাছে ঝরে যাওয়া পাতার বদলে নতুন পাতা আসে। চারদিক পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ায় শোভিত হয়ে ওঠে। এর প্রতিফলন ঘটেছে বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানে- ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে সই গো বসন্ত বাতাসে।’ ফুল ফোটার পাশাপাশি পাতার আড়ালে শুনতে পাই কোকিলের কুহুকুহু ডাক।

উৎসবের আকার-আয়তন বিবেচনায় পহেলা বৈশাখ অনেক বেশি আবেদন রাখলেও বসন্তকে বলা হয়ে থাকে ‘ঋতুরাজ’। শীত যেখানে রিক্ত হস্তে বিদায় নেয়, সেখানে বসন্ত আসে তার পুরো আমেজ ও অনুভূতি নিয়ে। বসন্ত উৎসবের কথা পুরাণে পাওয়া গেলেও কথিত আছে, ১৫৮৫ সালে মোগল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন। সেই সময়ে বাংলা বর্ষে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। তখন ঋতুর ধারণাটি স্পষ্ট করা না হলেও বসন্ত উৎসবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। আজ ঋতুর ধারণা স্পষ্ট হলেও বসন্তকেই বলা হয়ে থাকে ‘ঋতুরাজ’। তাই বসন্তের গৌরব ও ঐতিহ্য অনেক দিনের, অনেক যুগের, অনেক শতাব্দীর।

বসন্ত উৎসবটি বাঙালির সব বয়সির হলেও এতে তারুণ্যের প্রভাবই থাকে বেশি। এ দিনটিতে তরুণ-তরুণীরা বাসন্তী রঙের পোশাকে নিজেদের সজ্জিত করে। ফুল বিনিময় ও ব্যবহারের ধুম পড়ে যায়। তবে এ সময়ে এই ধরনের আয়োজন গ্রামাঞ্চলের পরিবর্তে শহরাঞ্চলেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু করোনার এ সময়ে আমরা এবার এর ভগ্নাংশও হয়তো উদযাপন করতে পারব না।

পহেলা ফাল্গুন চিরকালই আমাদের কাছে একটি আনন্দের দিন হিসাবে বিবেচিত হয়ে এলেও আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে তাতে ছেদ পড়ে। ১৯৫২ সালে ফাল্গুন মাসেরই ৮ তারিখে (২১ ফেব্রুয়ারি) আমাদের দেশের বীর সন্তানরা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে প্রাণ বিসর্জন দেন। তাই ৮ ফাল্গুন আমাদের জন্য শোকের দিন, সেদিক থেকে ফাল্গুন আমাদের জন্য বেদনার মাসও বটে।

পহেলা ফাল্গুনের আরেকটি ভিন্ন আমেজ রয়েছে, তা হলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। কাকতালীয়ভাবে আমাদের বসন্তের প্রথম দিনটি পড়েছে খ্রিষ্টীয় দিনপঞ্জির ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে, যা বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডে হিসাবে। বিশ্বের তাবৎ মানুষের মধ্যে ভালোবাসার অনুভূতি জাগাতেই এ দিবসটির অবতারণা। অতীতে এ দিবসটি মূলত পাশ্চাত্যের দেশগুলোতেই পালিত হতো। তবে বর্তমানে তা বিশ্বের সব দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ছড়িয়েই পড়েনি, বরং তা আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণভাবেই উদ্যাপিত হয়। যদিও এর ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের মতামত পাওয়া যায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি কেন ভালোবাসা দিবস? শোনা যায় প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল রোমান দেব-দেবীর রানী জুনোর সম্মানে ছুটির দিন। সে সময়ে জুনোকে মনে করা হতো নারী ও প্রেমের দেবী।

তাই ভালোবাসার দিবসটি ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যাপারে ভিন্নমতও আছে। ২০০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস সেদেশে যুবকদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেন। সম্রাটের ভাবনা ছিল, যুবকরা বিয়ে করলে যুদ্ধে যাবে কে? কিন্তু এই নিয়মের বিরোধিতা করেন এক সাহসী রোমান যুবক, নাম তার ভ্যালেন্টাইন। সে সময়ে সম্রাটের ঘোষণার বিরোধিতা মানেই মৃত্যুদণ্ড। কোনো এক ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শাস্তিস্বরূপ ভ্যালেন্টাইনের মাথা কেটে নেওয়া হয়। মনে করা হয়, এই ভ্যালেন্টাইনের নামেই আজকের ভালোবাসা দিবস।

আরেকটি ইতিহাস পাওয়া যায়, যা অনেকটা গ্রহণযোগ্য। প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে ভীষণভাবে কাছে টানতে পেরেছিলেন। কিন্তু সে সময়ে রোমে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে অনেক বিধিনিষেধ ছিল। ভ্যালেন্টাইন ছিলেন একদিকে চিকিৎসক, অন্যদিকে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারক। তাই সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের নির্দেশে ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সেই সূত্রে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে।

সত্য যা-ই হোক, ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিশ্বে ভ্যালেন্টাইন ডের উদ্যাপন শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে তা তেমন প্রচার পায়নি। এমনকি এর তাৎপর্যকে ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে কোনো কোনো দেশে দিবসটির উদ্যাপনও নিষিদ্ধ করা হয়। ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার সেদেশে দিবসটির উদ্যাপন নিষিদ্ধ করে।

তবে আজকের বিশ্বে এ দিবসটি পৃথিবীর কোনো দেশেই নিষিদ্ধ নয়; বরং দিন দিন এর জৌলুস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বিগত বছরগুলোয় দিবসটি ঘটা করে পালিত হয়ে এসেছে। তবে বিগত দিনের সঙ্গে আজকের বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে। আমরা এখন একটি অতিমারিকে মোকাবিলা করছি। স্বাভাবিকভাবেই গেল বছরের তুলনায় এবারের আমেজে ঘাটতি হবে।

ভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন এ নিয়ে দু-কথা বলার আগ্রহ জাগছে। প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসা দিবসের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী হচ্ছে প্রত্যেকের হৃদয়ে ভালোবাসার উষ্ণতা জাগিয়ে তোলা। যুবক-যুবতির প্রেম উৎসারিত ভালোবাসার বাইরেও ভালোবাসা আছে। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা, আত্মীয়স্বজনের প্রতি ভালোবাসা, পাড়া-পড়শির প্রতি ভালোবাসা, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, প্রাণিকূলের প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি মানবজীবনের সবক্ষেত্রেই ভালোবাসার আবহ তৈরি করা প্রয়োজন।

আজ বিশ্ব থেকে এসব ভালোবাসা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আগেই বলেছি, পশ্চিমা বিশ্বে এ দিবসটি ঘটা করে উদ্যাপন করা হয়। আমাদের দেশে তা হালের সংস্কৃতি। এর কারণ হলো, আসলে পুঁজিবাদী জীবনে মানুষ বড্ড বেশি একা হয়ে যায়। পুঁজিবাদ যতো বিকশিত হবে, মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো ততই বিলোপ পাবে। তাই ঘটা করে এগুলো ফিরিয়ে আনার তাগিদ অনুভূত হয়। কিন্তু আমাদের দেশটা পুঁজিবাদী পথে হাঁটলেও সমাজটা পুরোপুরি পুঁজিবাদী হয়ে যায়নি। এখনো ২৪ বছরের টগবগে কোনো তরুণ রিকশাওয়ালাকে যদি প্রশ্ন করা হয়- তার জীবনের লক্ষ্য কী? সে অনায়াসেই জবাব দেবে-ছোট ভাইটাকে ডাক্তার বানাব। ভবিষ্যতে সেই স্বপ্নের স্থান যেখানেই হোক না কেন, ওই মুহূর্তে ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসাটাই সত্য। এই সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের কারণেই আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের আবেদনটি পরে এসেছে। যদিওবা এসেছে, তা এখনো বড় আকারে প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝেই সীমাবদ্ধ আছে। এর থেকে বেরিয়ে এসে ভালোবাসাকে সর্বজনীন দৃষ্টিতে ফিরিয়ে আনতে হবে।