চসিকে রেজাউলের নতুন ইনিংস শুরু

  |  মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২১ |  ৪:০৪ অপরাহ্ণ

দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নবনির্বাচিত মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী।

গতকাল তিনটার দিকে টাইগারপাসস্থ নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি।

পরে সংস্থার বিভাগীয় প্রধানদের সাথে মতবিনিময় করেন মেয়র। এর আগে সকাল ১১ টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দায়িত্বগ্রহণ উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রেজাউল করিম চৌধুরী।

এসময় একশ দিনের মধ্যে মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ, ‘বিশৃঙ্খল’ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং সড়ক সংস্কারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

সভায় পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামকে মডেল শহর হিসেবে দাঁড় করানোর ঘোষণা দেন মেয়র। এ জন্য সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বলেন, অনেকে মনে করেন মেয়র নির্বাচিত হলে শহর শুধু মেয়রের। আমি সেই পুরনো ধারা ভাঙতে চাই। নগর শুধু মেয়রের নয়, সমস্ত চট্টগ্রামবাসীর। চট্টগ্রামকে সুন্দর করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমার যেমন আছে, প্রত্যেকের আছে। এই শহরে মেয়র যেমন থাকে, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষও থাকে। আমি সবার মেধা ও পরামর্শ কাজে লাগাতে চাই। যে পরামর্শ টেকসই উন্নয়নে প্রযোজ্য হবে এবং পরিকল্পিত চট্টগ্রাম গড়তে সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, আমার চিন্তা-চেতনার সঙ্গে এই শহরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে চাই। কারণ ব্যক্তির একক চিন্তার মধ্যে ভুল থাকতে পারে। সমষ্টিগত চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তখন কেউ মেয়রের দোষ ধরলে বলব, আপনাদের সাথে পরামর্শ করেই তো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাফল্য আসলেও সবাই এর ভাগীদার হবেন।

নগরবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, সবকিছুতে মেয়রকে দায়ী করা হয়। রাস্তায় যানজট সমস্যায়ও মেয়রের উপর দোষ এসে পড়ে। অথচ মেয়রেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আপনারা আমাকে নির্বাচিত করেছেন, আমি আপনাদের প্রতিনিধি। আমি শুধু আপনাদের মুখপাত্র। পাঁচ বছর আপনাদের পরামর্শেই আমি আমার কার্যক্রম এগিয়ে নেব। যে কারও পরামর্শ নিতে আমার কোনো সংকীর্ণতা নেই, তিনি নগণ্য হলেও। কারণ, নগণ্য লোকেরও মেধা আছে। নগণ্য বলে যাকে উপহাস করি তার পরামর্শও অনেক সময় কাজে লেগে যায়।

তিনি বলেন, মন্ত্রী সুধী সমাজ সাবেক মেয়র সেবা সংস্থার প্রধান, বিভিন্ন পেশাজীবী মুক্তিযোদ্ধা প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ যারা চট্টগ্রাম নিয়ে চিন্তা করেন সকলের পরামর্শ নিব। সকলের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। প্রমাণ করে দিতে চাই যদি সবাই একযোগে সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করি তাহলে এগিয়ে যেতে কোনো বাধা থাকবে না।

তিনি বলেন, অতীতে কি হয়েছে সেটা আমার কাছে বিবেচ্য নয়। আমি সবার সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে তুলবো স্বপ্নের নগরী। সমগ্র চট্টগ্রামই পর্যটন সিটি। এটাকে সুন্দরভাবে সাজানো গেলে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করা যাবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে এগিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবো।

তিনি বলেন, আমার স্বপ্নের কথা ইশতেহারে উল্লেখ করেছি। কামিয়াব আমরা হবোই। পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামকে মডেল শহর হিসেবে দাঁড় করাবো। সেই সততা সাহস, আমার আছে। কারণ অর্থবিত্তের প্রতি আমরা কোনো মোহ নেই। অর্থবিত্ত প্রাচুর্যের উপর আমি জন্মগ্রহণ করেছি। তাই অর্থবিত্ত আমাকে বিপথে চালিত করতে পারবে না। গত অর্ধশতাব্দীর রাজনীতিতে অর্থবিত্ত আমাকে বিপথে পরিচালিত করতে পারেনি। আদর্শচ্যুতও করতে পারেনি। তাই চেয়ারে বসেও কোনো মোহ আমাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।

যেসব কাজ অগ্রাধিকার পাবে :
সমাবেশে একশ দিনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে মেয়র বলেন, মশার উপদ্রবে নগরবাসী অতিষ্ঠ। মশা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিব। পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তুলবো। বিশৃঙ্খল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শৃঙ্খলায় আনার প্রয়াস থাকবে। অনেক রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল হয়ে আছে। ১০০ দিনের মধ্যে সব রাস্তা হয়ে যাবে, তা বলাটা হবে আবেগের এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। তবে যেসব রাস্তাঘাটে খানাখন্দ রয়েছে সেগুলোর সংস্কার করে যান চলাচলের উপযুক্ত করার চেষ্টা করবো। যাতে মানুষ দুর্ভোগ ও ভোগান্তিতে থেকে রেহাই পায়।

জলাবদ্ধতা নিরসন :
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একশ দিনের মধ্যে জলাবদ্ধতা মুক্ত করবো বলাটা হবে অবাস্তব চিন্তা-চেতনার প্রকাশ। সিডিএ’র মেগাপ্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আগামী বছর জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রামবাসী অনেকাংশে মুক্তি পাবে।
মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে ধীরে ধীরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন খাল খনন করতে হবে। জনগণের সম্পদ খাল অবৈধ দখল হয়েছে, যে কোনো মূল্যে আমরা তা উদ্ধার করবোই। নালা-নর্দমাও অনেকে দখল করে নিয়েছে। দখলদার উচ্ছেদ করে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারলে পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতামুক্ত শহরে পরিণত হবে।

স্মৃতি সংরক্ষণ :
মেয়র প্রশ্ন রেখে বলেন, পূর্ব পুরুষদের স্মৃতিকে আমরা সংরক্ষণ করতে পেরেছি? মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কথা দিতে পারি, পূর্ব পুরুষ যাদের জন্য আমরা গর্ববোধ করি, যাদের জন্য বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার চট্টগ্রাম বলি সেই পুর্বপূরষদের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করবো। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানান দিব চট্টগ্রাম তার ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।

সমন্বয় নিয়ে যা বললেন :
মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশন সুন্দর একটি রাস্তা করার দুই মাস পর খোঁড়াখুঁড়ি আরম্ভ হয়ে যায়। তখন দুর্ভোগ হলে জনগণ মেয়রকে গালাগালি করে। মেয়রের গোষ্ঠি কিলায়। কিন্তু এটা হয় পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবে।
তিনি বলেন, আমি সব সেবা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করব। এই সমন্বয়ের ক্ষেত্রে যারা গাফেলতি করবে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। অতীতে অনেক সমন্বয় সভা হয়েছে। কিন্তু সেসব সভার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সেগুলোর সুফল জনগণ পায়নি। যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে তার ফলোআপ হয়নি। মেয়রের নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে কথা এসেছে। সেটা থাকা উচিত। তাহলে সমন্বয়টা ফলপ্রসূ হবে। সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলাপ করে পরিকল্পনা করে যে কোনো কাজ করলে জনভোগান্তি কম হবে। জনগণের কষ্ট কম এবং টাকার অপচয় কম হবে।

তিনি বলেন, সব সংস্থাই কিন্তু দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের শুধু জনস্বার্থে এক হতে হবে।

বিভাগীয় প্রধানদের যে বার্তা দিলেন :
দায়িত্ব গ্রহণকালে দুর্নীতির ব্যাপারে ছাড় দিবেন না জানিয়ে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক জীবনে আমি নিজেও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিই নাই। ভবিষ্যতে কোন দুর্নীতিকে ছাড় দিবো না। যত প্রভাবশালী ব্যক্তি হোক না কেন দুনীতির ব্যাপারে আপোস করবো না। আমার অবস্থান থাকবে জিরো টলারেন্স। সিটি করপোরেশনের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিতে জড়ালে ছাড় দেওয়া হবে না।

বিভাগীয় প্রধানদের সাথে বৈঠকে তিনি বলেন, সিটি কপোরেশনের প্রধান কাজ তিনটি। রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আলোকায়ন। এ তিনটি কাজ সফলভাবে করতে পারলে ৮০ ভাগ নগরবাসীর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে। তাই কাজগুলোর বিষয়ে অবহেলার সুযোগ নাই। পরিচ্ছন্ন বিভাগে জনবল নিয়োগের ‘অনিয়ম’ নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ জানুয়ারি চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন রেজাউল করিম চৌধুরী। ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন তিনি।