প্রিপেইডে নতুন আশা

  |  শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১ |  ৩:৪৮ অপরাহ্ণ
প্রিপেইড

চট্টগ্রামে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহারে নতুন করে আরো তিন লাখ প্রিপেইড মিটার যুক্ত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে পৃথক দুই প্রকল্প। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক গড়ে প্রায় ২৫ লাখ ঘনমিটার গ্যাসের সাশ্রয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে আবাসিকের প্রায় ৬০-৭০ হাজার বার্নারে গ্যাস ব্যবহার সম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা।

‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অব প্রিপেইড গ্যাস মিটার ফর কেজিডিসিএল পার্ট-টু)’ নামে দুই লাখ মিটারের দ্বিতীয় প্রকল্পটি বৈদেশিক অর্থায়ন জটিলতার কারণে কিছুদিন ঝুলে থাকলেও অতি সম্প্রতি প্রকল্পটিতে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপম্যান্ট ব্যাংক (এডিবি)। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) এবং গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) দুই প্রকল্পে এডিবির দেওয়া ঋণের সাশ্রয়ী ৫৮ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি ৪৮৭ কোটি টাকা, ডলার ৮৪ টাকা হিসেবে) কর্ণফুলী গ্যাসের এই প্রকল্পে অর্থায়ন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ধারাবাহিক অংশ হিসেবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে প্র্রকল্পটির ফিজিবিলিটি স্টাডি নতুন ফরমেটে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এক লাখ মিটারের ‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অব প্রিপেইড গ্যাস মিটার ফর কেজিডিসিএল পার্ট-থ্রি)’ নামে তৃতীয় প্রকল্পটি সর্বশেষ সংশোধিত ডিপিপি গত সপ্তাহে পেট্রোবাংলার মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। তবে আগামী জুনের মধ্যে এক লাখ মিটার প্রকল্প এবং চলতি বছরের মধ্যে দুই লাখ মিটারের প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, ‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অব প্রি-পেইড গ্যাস মিটার ফর কেজিডিসিএল)’ নামে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটার সংযোজনের জন্য ২২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ওই প্রকল্পে ১৫৫ কোটি ৫৬ লাখ ২১ হাজার টাকা ঋণ সহায়তা দেয় জাইকা। ২০১৯ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়া ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সাকুল্যে ব্যয় হয় ১৪৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়িত প্রথম প্রকল্পটিতে প্রায় ৭৩ কোটি টাকার অধিক ব্যয় সাশ্রয় হয়। দেশের অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোতে জনপ্রিয় না হলেও চট্টগ্রামে কর্ণফুলী গ্যাসের আবাসিক গ্রাহকদের মাঝে প্রি-পেইড মিটার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে নতুন করে প্রি-পেইড মিটার পেতে কর্ণফুলী গ্যাসে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন আবাসিক গ্রাহকরা। ফলশ্রুতিতে মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে দুই লাখ মিটার সংযোজনের জন্য ‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অফ প্রিপেইড গ্যাস মিটার ফর কেজিডিসিএল পার্ট-টু)’ প্রকল্পটি হাতে নেয় কর্ণফুলী গ্যাস। ৫১৭ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে ১১৭ কোটি টাকা কর্ণফুলী গ্যাস নিজেদের তহবিল থেকে অবশিষ্ট চারশ’ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সুবিধায় চার বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়।

পরবর্তীতে বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে এক লক্ষ মিটার সংযোজনের জন্য ‘ন্যাচারাল গ্যাস ইফিসিয়েন্সি প্রজেক্ট (ইন্সটলেশন অফ প্রি-পেইড গ্যাস মিটার ফর কেজিডিসিএল পার্ট-থ্রি)’ প্রকল্পটি হাতে নেয় কর্ণফুলী গ্যাস। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা। তিন বছর মেয়াদী প্রকল্পটি বর্তমানে সর্বশেষ সংশোধিত হয়ে মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় নগরীর বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, চকবাজার, পাহাড়তলী, খুলশী, বাকলিয়া, সদরঘাট, কোতোয়ালী, হালিশহর, ডবলমুরিং, বন্দর, ইপিজেড, পতেঙ্গা, আকবরশাহ ও জেলার কর্ণফুলী, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা উপজেলা এলাকার গ্রাহকদের জন্য প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হবে।

এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দুই লাখ প্রি-পেইড মিটার প্রকল্পে ইতোমধ্যে এডিবি অর্থায়নের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পেট্রোবাংলা ও কর্ণফুলী গ্যাসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কয়েকদফা বৈঠকও হয়েছে। প্রকল্পটি নতুন সংশোধন করে এবং নতুন ফরমেটে ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় প্রকল্পটির আগে তৃতীয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এটির সর্বশেষ সংশোধনী ইতোমধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে জমা হয়েছে। এটি যেহেতু কর্ণফুলী গ্যাসের নিজস্ব অর্থায়নে হবে, সেহেতু মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলেই তারা টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। আশা করছি আগামী জুনের মধ্যেই কাজ শুরু করতে পারবেন তারা।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘কর্ণফুলী গ্যাসের ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটারের প্রথম প্রকল্পটি সফলতার সাথে সম্পন্ন হয়েছে। ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটার সংযোজনের পর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ গ্রাহকদের ব্যবহৃত গ্যাসের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৫ লক্ষ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে। সে হিসেবে নতুন তিন লাখ প্রি-পেইড মিটার সংযোজন হলে এসব গ্রাহকদের ব্যবহৃত গ্যাসের মধ্যে দৈনিক প্রায় ২৫ লক্ষ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হতে পারে। এ গ্যাস প্রায় ৬০-৭০ হাজার বার্নারে ব্যবহার সম্ভব বলে মত প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা যায়, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্পখাত মিলিয়ে চট্টগ্রাম গ্যাসের গ্রাহক রয়েছে ৬ লাখের বেশি। তন্মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৫ লাখ ৯৮ হাজারের কাছাকাছি। শিল্প গ্রাহক রয়েছে ১১২৭, বাণিজ্যিক গ্রাহক ২৮৬২, ক্যাপটিভ পাওয়ার ১৯০, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন ৭০টি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫টি ও সার কারখানা রয়েছে ৪টি। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা থাকে ৪৮০-৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি আমদানির আগে চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কম গ্যাস সরবরাহ দেয়া হত চট্টগ্রামে। এলএনজি আমদানির পর ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলেও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। এতে এলএনজি আমদানি কমে গেলে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে দৈনিক ২৬৫-২৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট (প্রায় ৭৫-৮০ লক্ষ ঘনমিটার) গ্যাস পাচ্ছে কেজিডিসিএল।