সংরক্ষিত চট্টগ্রাম কারাগার ‘অরক্ষিত’, অনিয়মই নিয়ম

  |  শুক্রবার, মার্চ ১২, ২০২১ |  ৪:১৫ অপরাহ্ণ
কারাগার

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের দক্ষিণ ও পূর্বদিকের বিশাল এলাকা এখনও অরক্ষিত। সীমানা প্রাচীরে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও তা ডিঙিয়ে পার হওয়া যায় অনায়াসে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে লাগানো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন ভিড় থাকে সাধারণ মানুষের। সেখানে রাখা হয়েছে মালামাল, গড়ে উঠেছে অবৈধ পার্কিং।

বন্দিদের রাখার জন্য তিনশ’ শয্যার পাঁচ তলা বিশিষ্ট যমুনা ভবনের পেছন দিকে কারাগারের বড় সীমানা প্রাচীর রয়েছে। প্রাচীরের ওপারে থাকা সড়কটি জেল রোড হিসেবে পরিচিত। সড়কের নিচ থেকে বন্দিদের নাম ধরে ডাকা হলে কিছু সময় পর সেই জানালার কাছে হাজির হয় ওই বন্দি। পরে ইশারা ও চিৎকার করে চলে কথা-বার্তা।

১৬.৮৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৮৫৩ জন। কিন্তু বন্দি থাকেন গড়ে ৯ হাজার। ১৯৯৮ সালে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নামে পাঁচতলা বিশিষ্ট ছয়টি বন্দি ভবন ও একটি দ্বিতল সেল ভবন নির্মাণ করে সরকার।

এখন ৪২টি সেল থাকলেও ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি থাকায় পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৩২ নম্বর সেলটি ৬৪ নম্বর সেলে রূপান্তর করা হচ্ছে বলে কারাগার সূত্রে জানা গেছে।

২০১১ সালে কারাগারে ঘনিষ্ট দুই কয়েদিকে আলাদা করে দেওয়ার ঘটনায় টয়লেটের ভেন্টিলেটর থেকে লাফিয়ে পড়ার হুমকি দেয় তারা। ২০১২ ও ২০১৫ সালে কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টাকালে দুজন ধরা পড়েন।

সর্বশেষ শনিবার (৬ মার্চ) ভোর ৫টা ১৬ মিনিটে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্ণফুলী ভবনের পঞ্চম তলার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায় হত্যা মামলার আসামি ফরহাদ হোসেন রুবেল।

নগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার পলাশ কান্তি নাথ বলেন, ‘নির্মাণাধীন চারতলা থেকে লাফ দিয়ে রুবেল প্রথমে কারা অভ্যন্তরের ২২ ফুট উচ্চতার দেওয়ালের বাইরে পড়ে। এরপর সেখান থেকে কারাগারের আরেকটি ১০ ফুট উচ্চতার দেওয়াল অনায়াসে টপকে পালিয়ে যায়। ’

কারাগারের পূর্ব পাশে সীমানা প্রাচীরে কাঁটাতারের বেড়া থাকলে অনেকগুলো বড় বড় ছিদ্র দেখা গেছে। এছাড়াও সীমানা প্রাচীর ডিঙিয়ে পার হওয়া যায় সহজেই। দক্ষিণ পাশের দেওয়াল থেকে লাফ দিয়ে সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে পালিয়ে যান কয়েদি রুবেল। দক্ষিণ পাশে কাঁটাতারের ফাঁক গলে আসা-যাওয়া করা যায়। প্রাচীরের সঙ্গে রয়েছে বাসা।

সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কারাগার থেকে মালামাল নিয়ে কারারক্ষীরা নিয়মিত আসা যাওয়া করে দক্ষিণ ও পূর্বপাশ দিয়ে। এছাড়াও সীমানা প্রাচীরের কাঁটাতার ডিঙিয়ে পার হয়ে থাকে কারারক্ষীরা। কারাগার থেকে মালামাল আনা নেওয়ার জন্য এই পথ ব্যবহার করে তারা।

কারাগারের ভিতরে ভবন থেকে মালামাল ফেললে তারা তা নিয়ে সীমানা প্রাচীর পার হয়ে চলে যায়। কারাগারের দক্ষিণ ও পূর্বদিকে একটি নিরাপত্তা টাওয়ার আছে। দিনের বেলায় একজন কারারক্ষী দেখা গেলেও রাতে মাঝে মধ্যে তাদের দেখা মেলে।

জানা যায়, কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা ও কারারক্ষী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে দর্শনার্থী নিয়ে বাণিজ্য, বন্দিদের নির্যাতন করে অর্থ আদায়, বন্দিদের মোবাইল ব্যবহার করতে দেওয়া ও ক্যান্টিনের খাবার সরবরাহে নানান অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

কারাগারকে অনিয়মের আখড়া বানিয়ে কারা কর্মকর্তারা গড়ছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে ধরাও পড়েছেন ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি কারাগার পরিদর্শন শেষে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার অনিয়মের তথ্যও পেয়েছেন। কারা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন খাতে মাসে অবৈধ আয় ৪০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছেন দুদকের এক পরিচালক।

কারাভোগ করে আসা ব্যক্তিদের ভাষ্য, এখানকার ডাল হচ্ছে হালকা হলুদ রঙের পানি। মোটা চালের শক্ত ভাতের সঙ্গে মেলে পচা সবজি, মাংসের ছোট হাড় ও ছোট একটি টুকরো মাছ। ক্যানটিনে নেওয়া হয় বাড়তি দাম। নতুন আসামি কারাগারে যাওয়ার পর প্রথমে ‘আমদানি ওয়ার্ডে’ রাখা হয়।

পরদিন সকালে ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয় তাদের। সেখানে চলে টাকার খেলা। প্রভাবশালী বন্দিরা তাদের নিয়ে কেনা-বেচা করে। কারাগারের সাক্ষাৎ কক্ষের লোহার জালি বেশ ঘন হওয়ায় কেউ কারও কথা শুনতে পারে না। তাই টাকা দিলে কারাগারের অফিস কক্ষে বিশেষ ব্যবস্থায় সাক্ষাতের সুযোগ মেলে।

সর্বশেষ সাতকানিয়ার মৌলভির দোকান এলাকার রতন ভট্টাচার্য নামের এক ব্যক্তি মোটা অঙ্কের টাকার দিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ঘটনা বেশ সমালোচিত হয়।

বৈদ্যুতিক শক ও বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে রুপম কান্তি নাথ নামের বন্দিকে কারাগারে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগে জেল সুপার, জেলারসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

চট্টগ্রাম কারাগারের সার্বিক বিষয়ে বিভাগীয় ডিআইজি প্রিজন্স একেএম ফজলুল হক বলেন, কারাগারের সীমানা প্রাচীরে কাঁটাতারের বেড়ার ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে চট্টগ্রাম কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কারাগারের সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে লাগোয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের নিরাপত্তায় সমস্যা হচ্ছে এটা ঠিক। তবে আইনগতভাবে এটা নিয়ে আমরা কিছু করতে পারি না। এটা আমাদের সীমানার চেয়ে দূরে আছে।

কয়েদি পালানোর ঘটনার পর সীমানা প্রাচীর ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমানা প্রাচীর চারপাশে উঁচু করা হচ্ছে। কাজ চলমান। অনেক স্থানে প্রাচীর উঁচু করার কাজ শেষ হয়েছে। আমাদের আরও কিছু সীমানা প্রাচীর উঁচু করার জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সেটা পাস হয়ে আসলে কাজগুলো হয়ে যাবে।