মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্রে ইসলামী মূল্যবোধ

  |  শুক্রবার, মার্চ ২৬, ২০২১ |  ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশপ্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ঈমানী চেতনা মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের ঈমানী চেতনা দীপ্তি প্রস্ফুটিত হয়েছে তাদের চিঠিপত্রে। মা-বাবা, সন্তান ও স্ত্রীদের উদ্দেশে প্রেরিত চিঠিতে তাদের বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত হয়েছে নানাভাবে। এমন কিছু চিঠির কথা নিম্নে তুলে ধরা হলো

চিঠির সূচনায় সালাম : মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগ চিঠি ইসলামের শান্তির বাণী সালাম দিয়ে শুরু করতে দেখা গেছে। যেমন—মা, আমার সালাম গ্রহণ করবেন। পর সংবাদ আমি আপনাদের দোয়ায় এখনো পর্যন্ত ভালো আছি। কিন্তু কত দিন থাকতে পারব বলা যায় না।…’ ইতি জিন্না। নৌ কমান্ডার শহীদ জিন্নাত আলী খান। মুকসুদরপুর, গোপালগঞ্জ।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা : মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন চিঠির বর্ণনায় মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার চিত্র পাওয়া যায়। তেমনি একটি চিঠি হলো, ‘মা, দোয়া করো। তোমার ছেলে আজ তোমার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চলছে।… পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে দোয়া করি, তোমার সন্তানরা যেন বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীকে কতল করে এ দেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। এ দেশের নাম হবে বাংলাদেশ, সোনার বাংলাদেশ।’ ইতি মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ। মিরপুর, ঢাকা।

ইনশাআল্লাহ ব্যবহার : ‘ইনশআল্লাহ’ বলা ইসলামী শিষ্টাচারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। স্বাধীনতাযুদ্ধের বক্তব্য ও নথিপত্রে ‘ইনশাআল্লাহ’ শব্দের বহুল ব্যবহার পাওয়া যায়। ছোট্ট মেয়েকে উদ্দেশ করে একজন মুক্তিযোদ্ধার চিঠিতে আছে—‘তুমি যখন ইনশাল্লাহ পড়তে শিখবে, বসতে শিখতে তখনকার জন্য আজকের এই চিঠি লিখছি। …মামণি, তোমার আম্মু লিখেছে, তুমি নাকি এখন কথা বলো। তুমি নাকি বলো, ‘আব্বু জয় বাংলা গাইত।’ ইনশাল্লাহ সেই দিন আর বেশি দূরে নয়, আব্বু আবার তোমাকে জয় বাংলা গেয়ে শোনাবে। যদি আব্বু না থাকি, তোমার আম্মা সেদিন তোমাকে জয় বাংলা গেয়ে শোনাবে।…’ ইতি তোমার আব্বু। আতাউর রহমান খান কায়সার। রাজনীতিবিদ, চন্দনপুরা, চট্টগ্রাম।

আল্লাহর হাতে জীবন-মৃত্যুর বিশ্বাস : ‘আল্লাহর আদেশে জীবন-মৃত্যু ঘটে’ মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে পরিবারকে এ বাক্যের মাধ্যমে সান্ত্বনা দিয়েছেন। স্ত্রীকে লেখা স্বামীর চিঠিতে এমনই চিত্র ফুটে ওঠে, ‘প্রিয় ফজিলা, আমার অফুরন্ত ভালোবাসা নিয়ো। আমার এই চিঠির ওপর নির্ভর করছে তোমার আগামী দিনের (সুখ ও দুঃখ)। এই চিঠি পড়ে দুঃখ পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ জন্ম ও মৃত্যু মানুষের হাতে নয়, এটা পরম করুণাময় আল্লাহর হাতে। তাঁর নির্দেশ ব্যতীত দুনিয়ার কোনো হাঁক হতে পারে না। তাই বলছি দুঃখ করো না।…‘ইতি তোমার স্বামী গোলাম রহমান। মুক্তিযোদ্ধা মো. গোলাম রহমান। মহত্পুর, খুলনা।

চিঠির শেষে দোয়া কামনা : চিঠির শেষে দোয়া কামনা ইসলামী শিষ্টাচারের অন্যতম। মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিতে এ রীতি অনুসরণ করতে দেখা যায়। একজন মুক্তিযোদ্ধার চিঠি ছিল এমনই—‘মা, তুমি এ দেশের স্বাধীনতার জন্য দোয়া করো। চিন্তা করো না, আমি ইনশাআল্লাহ বেঁচে আসব। তোমার চরণ মা, করিব স্মরণ।…’ ইতি তোমারই বাকী। শহীদ আব্দুল্লাহিল বাকী (সাজু) বীরপ্রতীক। খিলগাঁও, ঢাকা।

মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিগুলো প্রথমা থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের চিঠি’ বই থেকে সংগৃহীত।