সাগরের তলদেশে মজুদ গ্যাসে চলবে ১শ বছর

  |  বুধবার, মার্চ ৩১, ২০২১ |  ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ৩ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে মোনাজাইট, টাইটানিয়াম, আয়রন, জিরকন, রুটাইল, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, ফসফরাস, সালফেট ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা। এছাড়া সম্ভাব্য আরো প্রায় ১শ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস হাইড্রেটের মজুদের সন্ধান পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই গ্যাসে ১শ বছরের চাহিদা মিটানো যাবে।

গত ২৮ মার্চ কক্সবাজারের পেঁচারদ্বীপে বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নে সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শফিকুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইতি রাণী পোদ্দার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান।

সেমিনারে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৯-২০ অর্থবছরের গবেষণা ফলাফলসহ ৭টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা বিরল খনিজ সম্পদের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভূ-তাত্ত্বিক ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, আমাদের সাগরের তলদেশে গ্যাসের যে সম্ভাব্য মজুদ পাওয়া গেছে তা দিয়ে আমরা ১শ বছরের চাহিদা মিটাতে পারব। বর্তমানে দেশে মাত্র ১৪ বছরের গ্যাস মজুদ রয়েছে।

তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে যে বিরল খনিজ পদার্থ রয়েছে তার মধ্যে পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি ও নিরাপত্তাকাজে ব্যবহৃত খনিজও রয়েছে। আর এসব খনিজ উত্তোলন করে আমরা ব্লু-ইকনোমি বা সুনীল অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার খুলতে পারি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ড. শফিকুর রহমান বলেন, সমুদ্রে প্রায় ২শ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল। অথচ গড়ে ৩০ নটিক্যাল পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারছি। অধিকন্তু বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরার অনুমতি না থাকলেও তা মানছে না। গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা না থাকায় এদেশের জেলেরা উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরে। এদেশের জেলেরাও যাতে গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে আনতে পারে, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য শ্রীলংকা থেকে কয়েকজন জেলেকে আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, হ্যাচারিতে পোনার খাদ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার আর্টিমিয়া আমদানি করা হয়। অথচ তিন দশক আগেই এদেশের বিজ্ঞানীরা সফলভাবে আর্টিমিয়া তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এদেশের বিজ্ঞানীরা অতীতে অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। কিন্তু সেই প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগানো হয়নি। সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তিকে মাঠ পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। তবেই জাতি উপকৃত হবে।
সেন্টমার্টিনের কোরালের ওপর গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে কেমিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বা জুন-জুলাই মাসে নাফ নদীতে মিষ্টি পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে সেন্টমার্টিনে সাগরের লবণাক্ততা কমে যায়। এ সময় প্রবালগুলোর জীবনচক্রের ওপর কিছুটা চাপ পড়ে। বছরের বাকি সময়ে সেন্টমার্টিনের প্রবালগুলো স্বাস্থ্যবান থাকে।

বঙ্গোপসাগরের রূপতত্ত্ব তুলে ধরেন ফিজিক্যাল ও স্পেস ওশানোগ্রাফি বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রূপক লোধ ও শাহীনুর রহমান। সাগরের পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে গবেষণাপত্র তুলে ধরেন এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি ও ক্লাইমেট বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মীর কাশেম ও সুলতান আল নাহিয়ান। অপ্রলিত খাদ্য ভান্ডারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণাপত্র তুলে ধরেন ওশানোগ্রাফি ডাটা সেন্টারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তানিয়া ইসলাম।

আলোচনায় অংশ নেন পরমাণু শক্তি কমিশনের সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মাসুদ করিম, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ নাজমুল হুদা, মৎস্য বিশেষজ্ঞ পলাশ খন্দকার, ইকোলাইফের ম্যানেজার মো. আবদুল কাইয়ুম, শিল্পোদ্যোক্তা ওমর হাসান ও সাংবাদিক আহমদ গিয়াস। অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার মাহবুবুর রহমান সিকদার ও কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান বিপ্লব।