ইসলামের ইতিহাসে হাসপাতালব্যবস্থা

  |  শনিবার, এপ্রিল ৩, ২০২১ |  ৯:০৮ অপরাহ্ণ

হাসপাতালের ইতিহাস সুপ্রাচীন। ইসলাম ও মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে হাসপাতালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

সঠিক সন তারিখ বলা না গেলেও সেই ৭০৫ বা ৭১৫ সালে সেবাসদনের খোঁজ মিলে। সেটা খলিফা আল-ওয়ালিদের সময়কার কথা। তিনি দামেশকে এই সরাইখানা বা মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সত্যিকার অর্থে প্রথম প্রকৃত হাসপাতাল তৈরি হয় নবম শতাব্দীতে।

সেটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাগদাদে। তখন আরো পাঁচটি হাসপাতাল ছিল। সবচেয়ে নামকরা হাসপাতাল তৈরি হয় ৯৮২ সালে—বাগদাদে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন বাগদাদের শাসক অদুদ আল-দাওলাহ। এই হাসপাতালে ২৫ জন ডাক্তার, সার্জন ও হাড় সংযোজনকারী বিশেষজ্ঞ ছিল। অতীতে বাগদাদেই হাসপাতাল ছিল না। মুসলমানরা মিসরেও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে।

মিসরের গভর্নর ৮৭২ সালে কায়রোতে একটি মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১২ শতকে কায়রোতে আরো ভালো মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন বাদশাহ আল-মানসুর, যেটি ১৫ শতক পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখে। এই মানসুরি হাসপাতালে প্রতিদিন চার হাজার রোগীকে বিনা খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। সিরিয়া ও মিসরে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান করা হতো। এগুলোতে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির যেমন ব্যবস্থা ছিল, তেমনি থাকা ও খাওয়ারও আয়োজন ছিল।

প্রতিটি হাসপাতালে রোগীর জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ, রান্নার ঘর, বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখার গুদাম, ফার্মেসি এবং কর্মচারীদের জন্য থাকার ব্যবস্থাও ছিল। বড় বড় হাসপাতালে ছিল পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরি। ধনী ব্যক্তি ও ধার্মিক বাদশাহরা সেসব লাইব্রেরির জন্য ধর্মীয় এবং শিক্ষণীয় বইয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। ওই সব হাসপাতালে পুরুষ ও নারীদের আলাদাভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আবার হাসপাতালে বিভিন্ন রোগের জন্য আলাদাভাবে ডাক্তারের পরামর্শ এবং চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হতো। মানসুরি হাসপাতালে অনেক সময় দরিদ্র রোগীদের বিনা খরচে ওষুধ বিতরণ করা হতো।

প্রাচীনকালে আজকালকার মতো রোগ নির্ণয়ের জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারও ছিল। তবে এখনকার মতো ওই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অবহেলা ছিল না। না ছিল ভোগান্তি। একজন পরিচালক হাসপাতালের সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

ইসলামের ইতিহাসে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। তাঁরা এই কাজে নিজেদের সম্পদ এবং জমিজমা ওয়াকফ করে দিতেন। মজার বিষয় হলো, প্রাচীনকালে মুসলিম শাসকদের মাধ্যমে ও সমাজের ধর্মপ্রাণ ধনীদের মাধ্যমে যেসব হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তার বেশির ভাগ বিনা খরচে বা নগণ্য খরচে মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হতো।

আরো আশ্চর্য বিষয় হলো, চিকিৎসাসেবাকে উন্নত এবং আরো কার্যকর করার জন্য হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসা স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হতো। অভিজ্ঞ ডাক্তাররা চিকিৎসার পাশাপাশি স্কুল ও কলেজে নতুন নতুন চিকিৎসক তৈরির জন্য লেকচারের কাজও করতেন। এসব মেডিক্যাল স্কুল বা কলেজগুলো উন্নতমানের চিকিৎসাসামগ্রী এবং বই-পুস্তকে সমৃদ্ধ ছিল। এ কথা বলা আবশ্যক যে আধুনিক চিকিৎসার সূচনা হয়েছিল মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের হাত ধরে। বাগদাদ, মিসর ও সিরিয়ায় চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসা জ্ঞানের যে বাতি জ্বলেছিল, তা ক্রমে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম স্পেনে প্রথম ইসলামী হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্পেনের গ্রানাডায়। আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান তাই মুসলমানদের কাছে বহু অংশে ঋণী।