বিমানের ফাঁকা আসন। তাতে পর পর সাজিয়ে রাখা রক্তমাখা স্কুলব্যাগ। আর প্রতিটি ব্যাগের উপর ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়াদের ছবি। পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় যাওয়ার সময় বিমানে এ ভাবেই মিনাবের স্মৃতি পাকিস্তানে বয়ে নিয়ে গেল ইরান। এই ছবি পোস্ট করে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ লেখেন, ‘বিমানে এরাই আমার সঙ্গী, মিনাব১৬৮।’ অর্থাৎ মার্কিন এবং ইসরায়েলের নৃশংস হামলায় যে ১৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, পোস্টে ওই সংখ্যা উল্লেখ করে তা–ই বোঝাতে চেয়েছেন কালিবাফ। বস্তুত তিনি এই বার্তাই দেওয়ার চেষ্টা করলেন যে, কী নৃশংতার সঙ্গে খুদে পড়ুয়াদের খুন করেছে আমেরিকা এবং ইসরায়েল। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম দিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত স্কুল শিশুদের স্মরণে পাকিস্তানে আলোচনায় যাওয়া ইরানের প্রতিনিধি দলের নামও রাখা হয়েছে ‘মিনাব ১৬৮’।
ইসলামাবাদগামী তাদের ফ্লাইটে যাত্রীদের প্রথম সারিতেই যুদ্ধের এই স্মৃতিচিহ্নগুলো স্থান পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সাধারণ মানুষের প্রাণহানির এক মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ইরান দূতাবাস পরে কাফিবাফের পোস্টটি শেয়ার দিয়ে লিখেছে, ‘আমরা কখনোই মিনাবের শিশুদের ভুলবো না। কখনোই না।’
স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ অভিযোগ তোলেন, এই হামলায় নিজেদের দোষ ঢাকতে আমেরিকা এবং ইসরায়েল প্রথমে ইরানের বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তোলে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দাদের রিপোর্টেই দাবি করা হয়, এই হামলার জন্য দায়ী আমেরিকা এবং ইসরায়েল। সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরেও এই হামলার দায় স্বীকার করতে চায়নি তারা। কিন্তু শেষে ‘প্রযুক্তির ভুল’–এর কারণেই এই ঘটনা বলে দায় সেরেছে দুই দেশে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় একের পর এক হামলা চালায়, তারই এক পর্যায়ে এক স্কুলে তাদের হামলায় দেড় শতাধিক শিশু নিহতের খবর মেলে। প্রথমে একাধিক ইরানি গণমাধ্যম ও পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জানায়, দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে শাজারেহ তাইয়িবে স্কুলে হামলার সময় ভেতরে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অবস্থান করছিলেন। ওই হামলার কয়েকদিন পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি আকাশ থেকে গণকবর খোঁড়ার এক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেন। নিহত শিশুদের জন্য ওই কবরগুলো খোঁড়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিকে তোপ দেগে স্কুলে হামলাকে ‘ঠাণ্ডা মাথায় খুন’ আখ্যা দেন। তিনি বলেছিলেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল ইরানের দক্ষিণে। প্রকাশ্য দিবালোকে সেখানে বোমা মারা হয়েছে, তখন সেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা ছিল। কেবল এখানেই ডজন ডজন নিষ্পাপ শিশু খুন হয়েছে। ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে এই অপরাধের জবাব দেওয়া হবেই।
ট্রাম্প একবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে থাকা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা মনে করছি, এটা (হামলা) ইরান করেছে। কারণ তাদের অস্ত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালাতে পারে না, যেটা আপনারা জানেন। তারা নির্ভুল হামলা চালাতে পারে না।’ তবে পরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনী নিশানা ঠিক করতে ভুল করায় তাদের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রটি ওই শিশুদের স্কুলে গিয়ে পড়ে। এই ধ্বংসযজ্ঞ যে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রে হয়েছে সেটিও অনেক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। যুদ্ধে জড়িত তিন পক্ষের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই এ ক্ষেপণাস্ত্র আছে।
জুনায়েদ/চট্টলা২৪

