শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬

জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের রেকর্ড ব্যয় ১০.৬৩ বিলিয়ন ডলার

২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এক বছর আগের ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যয় দেশের মোট ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির ১৪ শতাংশের বেশি।

অর্থাৎ, মোট পণ্য আমদানিতে প্রতি ৭ ডলারের মধ্যে প্রায় ১ ডলারই খরচ হয়েছে জ্বালানি আমদানিতে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৬৮ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে তা ১০ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের এই ব্যয় ২০২০-২১ অর্থবছরের ৮ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারের আগের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। ওই সময়ে কোভিড-১৯ মহামারির পর বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছিল।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিমের মতে, মূলত চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণেই জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

মোট আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা জ্বালানির

অন্যান্য প্রধান আমদানি পণ্যের তুলনায় পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আমদানির সবচেয়ে বড় খাত মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। মূলধনি পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং খাদ্যশস্যের আমদানি ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

প্রধান শিল্পের কাঁচামালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি ৪ শতাংশ কমেছে। লোহা, ইস্পাত ও অন্যান্য বেস মেটালের আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। প্লাস্টিক ও রাবার আমদানিও কমেছে ২ শতাংশ।

অন্যদিকে, সারের আমদানি ৪২ শতাংশ, তেলবীজ ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রাসায়নিক পণ্যের আমদানি ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ওষুধপণ্যের আমদানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য মূলধনি পণ্যের আমদানি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

চাহিদা ও আন্তর্জাতিক দাম বাড়ায় বেড়েছে ব্যয়

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং দেশে চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ টন। তবে পুরো অর্থবছরের আমদানির পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

আমদানি করা জ্বালানির মধ্যে ছিল ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানির চাহিদা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ টন।

অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্টস পণ্য আমদানিতে ব্যয় ১০৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৬২ লাখ ২০ হাজার টন জ্বালানি আমদানি করা হয়েছিল। এর প্রায় ৭৬ শতাংশ ছিল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং ২৪ শতাংশ অপরিশোধিত তেল।

পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেড়েছে বেশি

অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম বেশি হারে বাড়ায় আমদানি ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাস অয়েল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের গড় আন্তর্জাতিক দাম ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৮৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ পরিশোধিত পণ্য হওয়ায় দামের এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিশোধিত জ্বালানির দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের পাশাপাশি পরিশোধন মার্জিনও যুক্ত থাকে। সরবরাহ বা পরিশোধন সক্ষমতায় সংকট তৈরি হলে কিংবা চাহিদা বাড়লে এই মার্জিন আরও বেড়ে যেতে পারে।

বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতায় বাড়ছে চাপ

কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা রয়েছে। মহামারির পর বৈশ্বিক অর্থনীতি সচল হলে তেলের দাম দ্রুত বাড়ে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেলের বাজারে বিশেষভাবে অস্থিরতা দেখা গেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলারে নেমে এলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় মার্চে ব্রেন্টের দাম ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে ওঠে। পরে তা ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

রেকর্ড ব্যয়ের মধ্যেই দেশে জ্বালানি সংকট

রেকর্ড আমদানি ব্যয়ের মধ্যেই সম্প্রতি দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। জ্বালানি কিনতে ভোক্তাদের ভিড়ের কারণে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।

এম তামিম বলেন, মূলত আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি কেনার কারণেই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল। জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ভোক্তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনেছিলেন।

ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে অন্তত দেড় মাসের জ্বালানি মজুত রাখা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকার জুনে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়ালেও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখে। জুলাই ও আগস্টেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাব্বির,চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

বিএনপি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে: নাহিদ ইসলাম

বিএনপি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ক্লাবে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ...

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়: ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা...

৯ দিনের মধ্যে ১০ শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করলেন চট্টগ্রাম ডিসি

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাসে নিহত ১০ শ্রমিকের...

গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নতুন অধিদপ্তর হচ্ছে

গুম, হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি...