বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

বড় সাজ্জাদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ডিবির হাতে বিএনপি নেতা হাশেম রাজুর জামাতা

চট্টগ্রামের আলোচিত আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের কথিত সহযোগী গোলাম সারোয়ার খানকে ঘিরে তার নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক পরিচয়, ডেনমার্কের ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দাবি করেছে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে নিজেকে মিয়ানমারের নাগরিক পরিচয় দিয়ে ডেনমার্কের ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেছিলেন সারোয়ার। পরে ওমানে পালিয়ে যাওয়ার সময় গত ৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডমেস্টিক ফ্লাইটের বহির্গমন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি কাগজপত্র ব্যবহার করে নিজেকে মিয়ানমারের নাগরিক দাবি করে ডেনমার্কের ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন সারোয়ার। পরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ওমানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

ডিবির দাবি, গোলাম সারোয়ার শুধু বড় সাজ্জাদের কথিত সহযোগীই নন, তার অধীনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে। এ অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

তবে সারোয়ারের শ্বশুর ও চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ হাশেম রাজু এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

রাজু দাবি করেছেন, সারোয়ার বড় সাজ্জাদের ফুফাতো ভাই বা সহযোগী—কোনোটিই নন। তার ভাষ্য, সারোয়ার মিয়ানমারের নাগরিক এবং প্রায় ২৮ বছর ধরে ডেনমার্কে বসবাস করছেন। তার পরিবার মিয়ানমারের রেঙ্গুনের পুরোনো ব্যবসায়ী পরিবার বলেও দাবি করেন তিনি।

রাজুর দাবি, পারিবারিক সূত্রে সারোয়ার মিয়ানমারের নাগরিকত্ব নিয়ে ডেনমার্কে যান। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং তার দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি গত ১৮ থেকে ১৯ বছর ধরে ডেনমার্ক বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি করেন রাজু।

তার মেয়ে সোনিয়া আফরোজ খানও ডেনমার্ক বিএনপির মহিলাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

তবে রাজুর বক্তব্যের এই অংশই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে তিনি সারোয়ারকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করছেন, অন্যদিকে তাকে দীর্ঘদিন ধরে ডেনমার্ক বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলছেন। একজন বিদেশি নাগরিক কীভাবে একটি বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক পদে রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

সারোয়ারের সঙ্গে বড় সাজ্জাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নাকচ করেছেন রাজু। তার দাবি, বড় সাজ্জাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন তৎপর, তখন সারোয়ার বাংলাদেশে এসে বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করবেন—এ বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

অন্যদিকে বড় সাজ্জাদ নিজেই গোলাম সারোয়ারকে তার কোনো আত্মীয় বা সহযোগী নন বলে দাবি করেছেন। সিটিজি পোস্টকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সারোয়ার বিভিন্ন জায়গায় তার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির সময় নিজেকে তার ফুফাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দিতেন।

বড় সাজ্জাদের দাবি, তার নাম ব্যবহার করে গোলাম সারোয়ার চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও সাবেক এমপি সিআইপি মুজিবের কাছ থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আরও কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীকে জিম্মি ও হুমকি দিয়ে সারোয়ার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এ ছাড়া বড় সাজ্জাদের দাবি, গোলাম সারোয়ার দুবাইয়ের কয়েকটি নম্বর ব্যবহার করে এলাকাভেদে কখনো নিজেকে বড় সাজ্জাদ, কখনো বোরহান, রায়হান অথবা ডেভিড ইমন পরিচয় দিতেন। এসব পরিচয় ব্যবহার করে হুমকি, ভয়ভীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে চাঁদা আদায় করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র সিটিজি পোস্টকে জানিয়েছে, সারোয়ারের প্রকৃত পরিচয় যাচাই করতে তার বায়োমেট্রিক তথ্য ও এনআইডির কপি ডেনমার্ক দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। ডেনিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তার ট্রাভেল ডকুমেন্ট বাতিল এবং ডেনমার্কে আজীবন প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, সারোয়ার বড় সাজ্জাদের ফুফাতো ভাই ও সহযোগী। বড় সাজ্জাদের অধীনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন অপরাধে তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে গোলাম সারোয়ার খানের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গোলাম সারোয়ার খান এখনো ঢাকা কারাগারে আছেন। তাকে এখনো চট্টগ্রামে আনা হয়নি।

তিনি বলেন, বড় সাজ্জাদের সঙ্গে সারোয়ার কী ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের অনুসন্ধান চলছে।

সব মিলিয়ে গোলাম সারোয়ার খানের পরিচয় এবং বড় সাজ্জাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। পুলিশ তাকে বড় সাজ্জাদের ফুফাতো ভাই ও সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য থাকার দাবি করছে। অন্যদিকে বড় সাজ্জাদ নিজেই তাকে আত্মীয় বা সহযোগী হিসেবে অস্বীকার করে তার নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—গোলাম সারোয়ার খান আসলে কোন দেশের নাগরিক? কোন পরিচয়ে তিনি ডেনমার্কের রিফিউজি স্ট্যাটাস ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট পেয়েছেন? মিয়ানমারের নাগরিক হয়েও কীভাবে ডেনমার্ক বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন? আর বড় সাজ্জাদের নাম ব্যবহার করে তিনি আসলে কী ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হলে।

সাব্বির, চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া ‘কারাত-২০২৬’ উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন

যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর জাহাজ USS WARRIOR আজ রবিবার (০১-১১-২০২৬) চট্টগ্রাম...

বসুন্ধরায় ফ্ল্যাটে হামলা চালিয়ে লুটপাট, যুবলীগের শহিদুল পুলিশের জালে

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের ৩৪ নং সড়কের...

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালির অভিযোগে বৃদ্ধের ২০ দিনের কারাদণ্ড

চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালির অভিযোগে মনজুর আলম (৬৫) নামে...