রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের ৩৪ নং সড়কের একটি ভবনের কয়েকটি ফ্ল্যাটে হামলা চালিয়ে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানো হয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ভবনে প্রবেশ করে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবু বকর সিদ্দিকীর ফ্ল্যাটের বেসিন, কমোড থেকে শুরু করে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেয়া হয় যুবলীগের শহিদুল হাকিমের নেতৃত্বে।
দুর্বৃত্তরা ওই ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙার চেষ্টা করলে ৯৯৯-এ ফোন দিয়েও প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ আবু বকরের স্ত্রী জেবুন্নেসার।
হামলার ভয়াবহতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে জেবুন্নেসা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর পুলিশ অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে আমার দুই মাস বয়সী শিশু সন্তানসহ আমাকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে তারা ফ্ল্যাটে ঢুকে বেসিন, গ্লাস, কমোড, মোবাইল ফোন ভাঙচুর করে। আমার দুই মাসের বাচ্চা পর্যন্ত হামলা থেকে রেহাই পায়নি।’
জেবুন্নেসা বলেন, ঘটনার ভয়াবহতায় শিশু সন্তানসহ ওই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।
‘আমরা থানায় অভিযোগ করার পরও উল্টো মামলার জালে ফাঁসিয়ে আমার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার এজাহারের জন্য থানায় ডেকে নিয়ে তাকে হামলাকারী শহিদুলের করা মামলায় চালান দেয়া হয়।’
ঘটনার নয় দিন পরে সপ্তাহ পর ভুক্তভোগী জেবুন্নেসার করা মামলায় ২৯ অক্টোবর ফ্ল্যাট ভাঙচুর, স্বর্ণালঙ্কার ও আসবাবপত্র লুটপাটের অভিযোগে যুবলীগ নেতা শহিদুল হাকিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে ভাটারা থানা পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আবু বকর (বর্তমানে কারাগারে) ও তার স্ত্রীর অনুপস্থিতির সুযোগে গত ২৬ অক্টোবর রাতে ট্রাকে তাদের বসবাস করা ফ্ল্যাটটির সব আসবাবপত্র, গৃহস্থালি সামগ্রী, লাইট-ফ্যান, বাচ্চার ব্যবহৃত সামগ্রী, এমনকি ফ্ল্যাটের দরজা খুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয় শহিদুল হাকিম চৌধুরী ও তার দলবল। আনা হয় ট্রাক। ট্রাকে আসবাবপত্র তোলার সময় রাত দেড়টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সিকিউরিটির লোকজন গিয়ে ট্রাকটিকে আটকে দিলে পুরো ঘটনা জানাজানি হয়। অভিযোগ পেয়ে ভাটারা থানার পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই ট্রাক ও শহিদুল চক্র সটকে পড়ে।
পরদিন ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার পুনরায় ট্রাক ভাড়া করে এনে ফ্ল্যাটের সবকিছু সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে নিবৃত্ত করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এ দফায় চট্টগ্রাম থেকে এসে ভাটারা থানায় অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগী জেবুন্নেসার বড় ভাই মিন্টু চৌধুরী। মামলার দুদিন পর গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকালে ফকিরাপুল এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে শহিদুল হাকিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি আসামিরা এখনও অধরা।
জানতে চাইলে ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, পুরো ঘটনাটি নজরে আসার পর ওই ফ্ল্যাটটির মালিকের স্ত্রী জেবুন্নেসার অভিযোগ গ্রহণ করে মামলা রুজু করা হয়েছে। দুই পক্ষ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, নির্মিত ভবন ও জমিটির যৌথ মালিক। তবে ফ্ল্যাটে অনুপ্রবেশ করে ভাঙচুর-লুটপাটের অভিযোগে আসামি শুধু শহিদুল হাকিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার নথি (ভাটারা ৪২/৪৩০) অনুযায়ী, ভুক্তভোগী জেবুন্নেসার অভিযোগ গ্রহণ করে ২৭ অক্টোবর ভাটারা থানা মামলা নথিভুক্ত করে। মামলায় শহিদুল হাকিম চৌধুরীসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৪২৭, ৩৮০, ৩০৭, ৫০৬, ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আরও ৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে মামলায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্রেপ্তার শহিদুল হাকিমের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। তিনি চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহরে বসবাস করতেন। বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।
যুবলীগের সম্মেলনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শহিদুল হাকিমের ছবি রয়েছে। তার পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় শহিদুল ও তার ভাই শিপন চৌধুরী যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শহিদ ট্রাভেল ব্যবসা করে। ভুক্তভোগী আবু বকর সিদ্দিকীর বোনের স্বামী তিনি।
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২১ অক্টোবর রাতে ওই ফ্ল্যাটে শহিদুল হাকিম ও শিপন চৌধুরী দলবল নিয়ে হামলা চালায়। ফ্ল্যাটটির মালিক আবু বকর পেশায় একজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ছিলেন। বছরখানেক আগে দেশে ফিরে স্ত্রীকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন।
আবু বকরের স্ত্রীর বড় ভাই মিন্টু বলেছেন, ‘তিন দফা হামলা চালিয়ে পুরো ফ্ল্যাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পরপর ৯৯৯-এ আমার বোন ফোন দিলেও প্রতিকার পাননি। পুলিশের নির্লিপ্ততার কারণে দরজা-জানালা, আসবাবপত্র পর্যন্ত লুট করে নিয়ে গেছে। ট্রাকে করে পুরো বাড়ির মালামাল সরিয়ে নেওয়ার মতো নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে।’
বাড়িটির অন্য একটি ফ্ল্যাটে (আবু বকরের ভাড়াটিয়া) ভাড়া থাকেন জেনিফার সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম দফায় ২০ অক্টোবর নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে হামলা হয়। ২৪ অক্টোবর রাতে পুনরায় হামলা চালিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। ওই ফ্ল্যাটের ওয়াশরুমের বেসিন, কমোড—সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গভীর রাতে ট্রাকে করে ফ্ল্যাটের আসবাবপত্রসহ সবকিছু সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে মালিককে খবর দিই। পরে আবাসিক এলাকার নিরাপত্তাকর্মীরা মালামাল সরাতে বাধা দেন। খবর পেয়ে রাত দেড়টার দিকে পুলিশ আসে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজের ভগ্নিপতি শহিদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় বসুন্ধরা আবাসিকে তিন কাঠা জমি কিনে সাততলা ভবন নির্মাণ করেন প্রবাসী আবু বকর। নিজের স্ত্রী জেবুন্নেসাকে নিয়ে এক বছর ধরে ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছিলেন। মঙ্গলবার দলবল নিয়ে জেবুন্নেসা ও তার দুই মাস বয়সী শিশুসন্তানের ওপর আক্রমণ চালান শহিদ। এ সময় ৪০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ লাখ টাকা লুট করা হয়।
এ ঘটনায় ২৭ অক্টোবর ভাটারা থানায় সাতজনকে আসামি করে মামলা করেন জেবুন্নেসা। বৃহস্পতিবার ভাটারা থানার এসআই সরওয়ার ওয়াদুদ অভিযান চালিয়ে শহিদুলকে গ্রেপ্তার করেন।
ভাটারা থানার এসআই সরওয়ার ওয়াদুদ বলেছেন, ‘প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে পুলিশ।’
ভাটারা থানা সূত্রে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন আবু বকর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের ৩৪ নং সড়কে তিন কাঠা জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কাজ ধরান। সাততলা বাড়িটির নির্মাণের খরচ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় আবু বকরের সঙ্গে। কাজ সম্পূর্ণ করতে এস্টিমেটের দ্বিগুণ অর্থ দাবি করছিলেন বোনজামাই শহিদুল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নিজের অর্থে দুটি ফ্ল্যাটের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। শহিদুল হাকিম চৌধুরীর অব্যাহত হুমকির ধকল সহ্য করতে না পেরে এই বিষয়ে ছয় মাস আগে রাজধানীর ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিকী।
শহিদুল হাকিমের রাজনৈতিক শক্তিমত্তার কারণে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন সেই ডায়েরিতে। থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় বাড়ির নির্মাণ কাজে ব্যয় হওয়া বাড়তি টাকার (শহিদুলের দাবি অনুযায়ী) দাবি ছেড়ে দিয়েছিলেন আবু বকর। কিন্তু সাধারণ ডায়েরি কোনো কাজে আসেনি। বরং প্রশাসনের ছায়ায় আবু বকর, তার স্ত্রী জেবুন্নেসা ও তাদের দুই মাস বয়সী শিশুর ওপর হামলা চালিয়ে হত্যাচেষ্টা করেছে শহিদুল-শিপন গং। সমঝোতা অনুযায়ী বাড়িটির বাকি কাজ কমপ্লিট না করে উল্টো ফ্ল্যাটে তাণ্ডব চালিয়ে পরিবারটিকে বাড়িছাড়া করার ফন্দি আঁটেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহিদুল হাকিম এই বাড়িতে বসবাস করেন না। ঢাকায় তার ফ্ল্যাট রয়েছে। সেখানেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। আর শহিদুলের ভাই শিপন বসবাস করেন মালিবাগে। যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য প্রকাশ হওয়ার ভয়ে শুরুতে শহিদুল হাকিম হুমকি দিলেও অক্টোবর মাসে বাড়ি দখলের নতুন করে পরিকল্পনা আঁটেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাঙচুর-লুটপাটে চট্টগ্রাম থেকে মিস্ত্রি পরিচয়ে আনা হয়েছে সুমন নামের আরেকজনকে, সে মূলত সন্ত্রাসী। ৪/৫ দুর্বৃত্ত জড়ো করে পুরো বাড়ি দখল করে নেন যুবলীগ নেতা শহিদুল হাকিম।
প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় ধামা হাতে (বড় ছুরি) ওই বাড়িতে প্রবেশ করছেন শহিদুল হাকিমের স্ত্রী। হামলার দিন শহিদের ভাই শিপন জনৈক সুমন (মিস্ত্রি), দারোয়ান সুমন ওই ভবনে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা সরিয়ে নেন। এরপর সবাই মিলে আবু বকরের ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙতে শুরু করেন।
ঘটনার শুরু থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর না হওয়া, ওই প্রবাসীর শিশু সন্তানসহ পুরো পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ি ছাড়ার মতো ঘটনার নিবিড় তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি নেতা ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রবাসে ঘাম ঝরানো অর্থ ব্যয় করে দেশে এসে বসুন্ধরা আবাসিকের মতো নিরাপদ এলাকায় বাড়ি নির্মাণের পর এমন লুটপাট-তাণ্ডবের মুখোমুখি হলে তো ইউরোপ-আমেরিকার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশবিমুখ হবেই। যতটুকু জেনেছি বোনজামাইকে অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়মিত টাকা পাঠিয়ে জমি ক্রয় করে সেই জমিতে যৌথ মালিকানায় বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন প্রবাসী আবু বকর সিদ্দিকী। আবু বকরের অনুপস্থিতিতে যিনি নির্মাণ কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন তিনি বাড়িটির কাজ পুরো সম্পন্নই করেননি। অথচ নির্মাণ কাজ শুরুর সময় প্রকৌশলী দ্বারা করা ব্যয় প্রাক্কলনের (এস্টিমেট) দ্বিগুণ অর্থ দাবি করছেন। দেশে ফিরে বাড়ি নির্মাণ বাবত পরিশোধ করা টাকার হিসাব চাইতে গিয়ে বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছেন প্রবাসী আবু বকর। প্রথমে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ঢুকে স্যানিটারি মালামাল, গৃহস্থালি পণ্য সবকিছু ভাঙচুর। পরদিন আবার পুনরায় তাণ্ডব চালিয়ে স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকাপয়সা লুট করেছে। এমনকি ওই ফ্ল্যাটের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে যাচ্ছে। ভিডিওতে দেখলাম ট্রাকে করে পুরো বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে লাইট-ফ্যান-চুলা এমনকি বাচ্চার দোলনা পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাচ্ছে—রিডিকুলাস!’
প্রবাসে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আবু বকর সিদ্দিকীর কষ্টে উপার্জিত অর্থে নির্মিত বাড়ির ফ্ল্যাটে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর, ঘরের স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাটের ঘটনা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশিদের মাঝে।

