বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রামে পুলিশ-চালকদের সংঘর্ষ, আহত ১০ জন

একসময় চট্টগ্রামের গলিপথে সীমাবদ্ধ থাকা ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন অবাধে ছুটছে সড়ক-মহাসড়কে। যে কারণে প্রতিদিনই ঘটছে কোন না কোন প্রাণহানি-দুর্ঘটনা। এমন বাস্তবতায় অবৈধভাবে চলাচল করা এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গত দুই দিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করা হয়েছে। গতকাল বুধবারও (২৩ ফেব্রুয়ারি) অভিযানে নামে নগরীর চান্দগাঁও থানা পুলিশ। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বোপরোয়াভাবে চালানো এসব রিকশার চালকরা। পুলিশের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বাকবিতণ্ডায়। এক পর্যায়ে শুরু হয় সংঘর্ষ। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ইট পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে, চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। হামলা চালানো হয় পুলিশের উপর, আহত হন পাঁচ পুলিশসহ বেশকয়েকজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর, সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সড়ক ছেড়ে পালিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা।

পুলিশের দাবি, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রধান সড়কে এসব রিকশা চলাচল করছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। আর চট্টগ্রাম নগরীতে নিয়মিত চলাচলকারীরা জানান, ধীরগতির এ বাহন দ্রুতগামী গাড়ির সঙ্গে মিশে গিয়ে সিগন্যাল পয়েন্টে জ্যাম সৃষ্টি করে; হঠাৎ রাস্তার মাঝে থেমে যাত্রী ওঠা-নামা করে, বড় গাড়ির লেনে ঢুকে পড়ে- সব মিলিয়ে এগুলো এখন বড় উৎপাত। প্রতিটি মোড়ে ব্যাটারি-চালিত রিকশা যানজট সৃষ্টি করছে। এছাড়া চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে রাস্তায় অতিক্রম করায় তাদের বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সব চালকরা। এদিকে অভিযান চালিয়ে এত গাড়ি জব্দ করা হলেও ফের ছেড়ে দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। তারা বলছে, একটি টোকেন দিয়ে টাকা নিজেদের পকেটে ঢুকিয়ে ধান্দায় ব্যস্ত পুলিশ। এসব অভিযান লোক দেখানো ছাড়া কিছুই নয়।

বুধবার দুপুরে সরেজমিনে চান্দগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকায় দেখা যায়, সকালে শতাধিক অটোরিকশাচালক কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে বাহির সিগন্যাল এলাকায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় তাঁরা অটোরিকশা জব্দ ও বন্ধের প্রতিবাদে স্লোগান দেন। শুরু থেকে পুলিশ সেখানে অবস্থান করছিল। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের সরাতে গেলে বিক্ষুব্ধ চালকেরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়েন। এরপর পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের একটি দল সেখানে উপস্থিত হলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকেরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সেখানে কোনো গাড়ি দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। সড়কের ওপর ইটের ভাঙা অংশ ও পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়।

চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, সিএমপি কমিশনারের নির্দেশে চান্দগাঁও বাহির সিগন্যাল এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে পুলিশ। সংঘর্ষ চলাকালে কিছু সময়ের জন্য সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। দুপুরের পর থেকেই এখন পর্যন্ত (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজগুলো বন্ধ করে দিচ্ছি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা এবং কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

জানতে চাইলে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ইজি বাইক সংগ্রাম পরিষদ চট্টগ্রাম শাখার আহ্বায়ক আল কাদেরী জয় বলেন, ‘আজ আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু কয়েকদিনের অভিযানে কয়েক হাজার ব্যাটারি রিকশা, ইজিবাইক জব্দ করা হয়েছে। এটি তো শ্রমিকদের জীবিকা। তাই ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। এটার একটা সুরাহা হওয়া উচিত। নগরে অন্তত দেড় লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক আছে। কিন্তু এগুলো কোথায় চলতে পারবে, কীভাবে চলতে পারবে তার কোনো নীতিমালা নেই। পুলিশ যেখান থেকে পারছে, ধরে নিয়ে যাচ্ছে, চালকদের হয়রানি করছে। এটাতো হতে পারে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবশেষ গত ১৮ এপ্রিল রাতে চকবাজার থানার কাপাসগোলা এলাকায় একটি ব্যাটারি-চালিত রিকশা উল্টে গিয়ে পড়ে হিজড়া খালে। রিকশায় থাকা দুই নারী বেঁচে গেলেও, তাদের কোলে থাকা ৬ মাস বয়সী শিশু সেহরিজ নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে চাক্তাই খাল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোক। পাশাপাশি ক্ষোভের সঞ্চারও হয়। এরপর নগরজুড়ে ব্যাটারি-চালিত রিকশার বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। টানা কয়েকদিনের অভিযানে বিভিন্ন এলাকা থেকে জব্দ করা হয়েছে প্রায় তিন হাজার অটোরিকশা। নগর পুলিশের আওতাধীন ট্রাফিক বিভাগের ডাম্পিং স্টেশন মনসুরাবাদ ও সদরঘাটে জায়গা প্রায় পুরোটা ভরে গেছে জব্দকৃত রিকশায়।

এদিকে, অভিযান কঠোর হলেও সরেজমিনে চকবাজার, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, চাক্তাই, কাজীর দেউড়ি, হালিশহর ও পতেঙ্গা এলাকা ঘুরে দেখা যায় এখনো সড়কে বেপরোয়াভাবে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রামের হালিশহর থানার সামনে বেপরোয়া গতির এক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক নিজে বাঁচতে যাত্রীসহ গাড়িটি খালে ফেলে দিয়েছেন। এই ঘটনায় কেউ আহত না হলেও খালে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার করেছেন স্থানীয়রা।

নগরবাসীর অভিযোগ, কিছু এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব রিকশা নির্বিঘ্নে চলছে। কোনো কোনো চালক জানান, আটক হলে জরিমানা দিয়েও তারা রাস্তায় থাকে। আবার প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেয়। আটকের পাশাপাশি অনেক চালককে জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এসব রিকশা আবার নিয়মমাফিক ছাড়িয়ে নেওয়া হয় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই পুনরায় চলাচল শুরু করে।

অক্সিজেন এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রতিদিন অফিসে যেতে রাস্তায় বের হলে দেখি ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইন। তারা কখনও হঠাৎ থেমে যায়, আবার উল্টো পথে চলে আসে। গত সপ্তাহে এক রিকশা আমার বাইকের সামনে ধাক্কা দেয়। আমি পড়ে গিয়ে হাতের কনুইতে চোট পাই। এসব রিকশা চালক আইনও মানে না। তাদের যেন কেউ থামাতে পারছে না।

একই কথা জানান বেসরকারি চাকুরিজীবি শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, নগরের চকবাজার এলাকায় প্রতিদিনই শতশত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। তারা মুহূর্তের মধ্যেই কখনো ডানে, কখনও বামে চলে যায়। যেই কারণে অন্য চালকরা তাদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে ঝামেলা হয়। এতে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

এদিকে অভিযান চালিয়ে এত গাড়ি জব্দ করা হলেও ফের ছেড়ে দেওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। আরাফাত হোসেন নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, একটি টোকেন দিয়ে টাকা খেয়ে শুনেছি জব্দের পরপরই গাড়িগুলো আবার ছেড়ে দিচ্ছে পুলিশ। তারা ধান্দার নতুন রাস্তা বের করেছে। মাঝখান দিয়ে জনগণকে আইওয়াশ করছেন। এসব অভিযান লোক দেখানো ছাড়া কিছুই নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, আমি প্রায় সময় বাসে করে কালুরঘাট থেকে ২ নম্বর গেট যাই। কিন্তু ব্যাটারি রিকশার কারণে বাসগুলো প্রতিটি সিগন্যালে আটকে থাকে। সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো মুশকিল হয়ে যায়। অথচ মূল সড়কে এই রিকশাগুলোর থাকারই কথা নয়। প্রশাসন মাঝেমধ্যে ধরপাকড় করে, আবার ওরা ফিরে আসে আগের মতোই।

চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন কী পরিমাণ ব্যাটারি-চালিত রিকশা চলে, তার সঠিক কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংখ্যাটি ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। এই বিশাল সংখ্যক রিকশা চালাচ্ছেন মূলত অপ্রশিক্ষিত, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞ কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকেরা। ফলে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে কয়েকগুণ।

সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, বায়েজিদ, খুলশী, কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, হালিশহর ও আকবরশাহ থানা এলাকাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভীবাজার থেকে কালুরঘাট ব্রিজ, ওয়াসা রোড, পাঠাইন্না গোদা, হামিদচর, ওসমানিয়াপুল, সিএন্ডবি এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১০–১২ হাজার রিকশা চলে। এছাড়া বাকলিয়া থানা এলাকার এক্সেস রোড, চকবাজার, ধনিয়ারপুল, সৈয়দ শাহ রোড, বড় কবরস্থান, পুলিশ বিট, আব্দুল লতিফ হাট, চেয়ারম্যান ঘাট, আন্দরকিল্লা ও টেরিবাজার এলাকা মিলিয়ে চলে প্রায় ৫ হাজার রিকশা। পাশাপাশি খুলশী, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ থানার আওতাধীন বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায়ও কয়েক হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করে। পুরো নগরজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাহমুদা বেগম জানান, মূল সড়কে দুর্ঘটনার বড় কারণ এই ব্যাটারিচালিত বাহনটি। তাদের দৌরাত্ম্য কমাতেই অভিযান শুরু করা হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। কাজেই এগুলোর চলাচল অবৈধ। তবে জব্দ করা গাড়িগুলো সংরক্ষণের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে জরিমানা করেই ছেড়ে দিতে হচ্ছে। যেদিন ধরা হয়, সেদিনই অনেক সময় ছেড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে চালকেরা মনে করছেন, আইন না মানলেও সমস্যা নেই।’

তবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এসব অভিযানের ফল টেকসই হবে না। দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে ব্যাটারি ও যন্ত্রাংশ আমদানির লাগাম টানতে হবে।

চৌধুরী/চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালির অভিযোগে বৃদ্ধের ২০ দিনের কারাদণ্ড

চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালির অভিযোগে মনজুর আলম (৬৫) নামে...

সড়ক নিরাপত্তায় হাটহাজারীর স্কুলছাত্রীদের সচেতনতামূলক কর্মশালা

চট্টগ্রামে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা হ্রাসে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে...

শিশু নিখোঁজ হলে সবার আগে যা করবেন

৩ সেপ্টেম্বর বিকেলের ঘটনা। আমার বাসার সহকারীর আসল নাম...

চট্টগ্রামে বিয়ে শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা, নারীসহ নিহত ২

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার...