পুলিশ পদক নিয়ে বির্তক থামছেই না। ফ্যাসিবাদ আমলে রাতের ভোট দিনে সম্পন্ন করতে ভূমিকা পালনকারী, ভোটকেন্দ্র দখলে সহায়তাকারী এবং লবিংয়ে এগিয়ে থাকা কর্মকর্তাদেরই দেয়া হতো পুলিশ পদক। তবে অন্তবর্তীকালিন সরকারের সময় সর্বোচ্চ সর্তক থেকে পদকপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করার পরেও বির্তক বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল হক ডাবলুসহ ৪জন পুলিশ কর্মকর্তাকে পদক দেয়া হচ্ছে। যারা আওয়ামী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী থেকে বিগত সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ বছর সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৬২ জনকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) দেয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪০০ জনকে এই পদক দেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক পুলিশসদস্যকে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ছিল। ফলে এই পদক নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন ওঠে।
অন্যদিকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে এবার পুলিশ সপ্তাহ ২৯ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত তিন দিন অনুষ্টিত হবে। তবে এবার কোনো প্যারেড হবে না। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহের কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর তিনি পুলিশ সদস্যদের পদক পরিয়ে দেবেন।
পদক প্রদান কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এবার পদক প্রদানের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চেয়ে মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পদক প্রদান কমিটি মূলত কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত সদস্যদের নাম চূড়ান্ত করেছে। ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপিদের নাম চূড়ান্ত করেছেন আইজিপি।
পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরও পুলিশে গুণগত পরিবর্তন আসেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ভূমিকা রাখা কর্মকর্তারাও এ বছর পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে পদক পাচ্ছেন। পদকের তালিকার ৩৮ নম্বরে আছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মনিরুল হক ডাবলু। ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি এক ডিও লেটারে ডাবলু সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবু লেখেন, মনিরুল হক ডাবলু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লিয়াকত-বাবু কমিটিতে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির পক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসাবে দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সে ব্যক্তিগতভাবে মুজিব সৈনিক এবং শেখ হাসিনার একজন নির্ভীক কর্মী। ডাবলু ডিএমপির নিউ মার্কেট থানায় কর্মরত থাকা অবস্থায় থানায় ওসির পদায়নের জন্য এই ডিও লেটার ব্যবহার করেছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে পদায়ন করা হয় ঢাকার আশুলিয়া থানার ওসি হিসাবে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে তিনি আশুলিয়া থানায় যোগদানের পরই। ডাবলুর দলীয় পরিচয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তাকে ক্লোজড করা হয় পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে। সম্প্রতি তাকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি করা হয়। এছাড়া আরও তিনজন বির্তকিত পুলিশ কর্মকর্তাকে পদক দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এবার বিপিএম-পিপিএম পদক পাচ্ছেন ৬২ জন: ২৯ এপ্রিল রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫-এর উদ্বোধন এবং বিপিএম-পিপিএম পদক দেবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মোট চারটি ক্যাটাগরিতে পুলিশ পদক দেওয়া হয়। এগুলো হলো বিপিএম-সাহসিকতা, বিপিএম-সেবা, পিপিএম-সাহসিকতা ও পিপিএম-সেবা। পদক দেয়ার জন্য এবার পুলিশ সদর দপ্তর সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি নাম চূড়ান্ত করলে সেই তালিকা অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পদকপ্রাপ্তদের নাম এরই মধ্যে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে বিপিএম এবং পিপিএম পদকের জন্য চূড়ান্তভাবে যারা তালিকাভুক্ত হয়েছেন। তারা হলেন-সাবেক আইজিপি ময়নুল ইসলাম, র্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) আবু নাছের মোহাম্মদ খালেদ, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) আকরাম হোসেন, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) ছিবগাত উল্লাহ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার ও অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) মাইনুল হাসান, উপমহাপরিদর্শক সরদার নুরুল আমিন, উপ-মহাপরিদর্শক কাজী মো. ফজলুল করিম, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ, জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, ডিএমপি ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম, সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া, অতিরিক্ত ডিআইজি আহম্মদ মুঈদ, পিবিআইর অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল, ঢাকার এসপি আনিসুজ্জামান, মাগুরার এসপি মিনা মাহমুদা, চট্টগ্রামের এসপি সাইফুল ইসলাম সানতু, পিবিআইর পুলিশ সুপার কুদরত-ই খুদা, ৮ এপিবিএনের এসপি খন্দকার ফজলে রাব্বি, ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার রওনক আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম মোহাইমেনুর রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল, নীলফামারীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা, ডিএমপির সহকারী পুলিশ সুপার এমজে সোহেল, দোহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-০১ এর সহকারী পুলিশ সুপার রাশেদুল ইসলাম বিশ্বাস, এপিবিএন উত্তরার পুলিশ পরিদর্শক গাজী গোলাম কিবরিয়া, পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্সপেক্টর আবদুর রাজ্জাক আকন্দ, সিএমপির ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ ফজলুল কাদের চৌধুরী, কেএমপির ইন্সপেক্টর শফিকুল ইসলাম, কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুল হক ডাবলু, আলমডাঙ্গার ওসি মাসুদুর রহমান, সিরাজগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখা পুলিশ পরিদর্শক একরামুল হোসাইন, কাউনিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা কামাল, পাবনা জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই শ্রী বেনু রায়, গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের এসআই সুমন মিয়া, গোদাগাড়ী মডেল থানা এসআই বরুন কুমার সরকার, কুমিল্লা জেলা পিবিআইর এসআই ফিরোজ আহাম্মদ, হবিগঞ্জ জেলার এসআই মাহমুদুল হাসান, মির্জাগঞ্জ থানার এসআই এনামুল হক, সিএমপির সোয়াট টিম কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের এসআই রাছিব খান, পুলিশ সদর দপ্তরের এসআই রকিবুল হাসান, ঢাকা জেলা পিবিআইয়ের এসআই ইমরান আহমেদ, সিরাজগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের এসআই মো. আশিকুর রহমান, মুন্সীগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা শাখার এসআই ইয়াসিন, খাগড়াছড়ি থানার এসআই আজিমুল হক, ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চে এএসআই কামরুজ্জামান, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল নিযুক্ত এএসআই নাজমুল হুসাইন, ভাটারা থানা এএসআই মেসবাহ উদ্দিন, র্যাব-১৫ এর হাবিলদার সাইফুল ইসলাম, সচিবালয় নিরাপত্তা বিভাগের কনস্টেবল রুহুল আমিন ভূঞা, ঢাকা এটিইউর কনস্টেবল হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের কনস্টেবল মোহাম্মদ জোনাইদুল হক, ডিএমপির পরিবহণ বিভাগের কনস্টেবল মোবারক হোসেন ও ডিএমপির পিওএম-পূর্ব বিভাগের কনস্টেবল রিয়াদ হোসেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশ-র্যাবের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১০৩ কর্মকর্তার বিপিএম ও পিপিএম পদক প্রত্যাহার করে। পদক প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার (এসপি), র্যাবের কর্নেল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল, কমান্ডার ও উইং কমান্ডার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা। পদক প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ১০৩ কর্মকর্তাকে ২০১৮ সালে দেওয়া বিপিএম ও পিপিএম পদক নির্দেশক্রমে প্রত্যাহার করা হলো।
ডেস্ক নিউজ/চট্টলা’২৪ হৃদয়

