নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে এক দামে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে একই সেবা ২৪ গুণেরও বেশি দামে বিক্রি, রাজস্ব ফাঁকি ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের ওপর আরোপিত ৩ কোটি টাকা প্রশাসনিক জরিমানা বহাল রেখেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করে মওকুফ ও পুনঃশুনানির আবেদন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে একাধিকবার শুনানি ও পর্যালোচনার পরও নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেনি বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, গত ২৯ জুন কমিশনের ৩০৮তম সভায় সামিট কমিউনিকেশনসের ওপর আরোপিত ৩ কোটি টাকা প্রশাসনিক জরিমানা বহাল রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক চিঠি পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিটিআরসির একটি পরিদর্শক দল সামিট কমিউনিকেশনসের ঢাকার প্রধান কার্যালয় এবং যশোরের বেনাপোলে অবস্থিত টেরিস্ট্রিয়াল কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন (টিসিএলএস) পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক কম দামে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ, একই বিআইএন নম্বরে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং ব্যান্ডউইথের মূল্য কম দেখিয়ে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিট কমিউনিকেশন্সের ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের নিজস্ব ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানকে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ গড়ে ৮ টাকায় সরবরাহ করা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য আইআইজি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ব্যান্ডউইথের গড় মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৯৬ টাকা ৬৫ পয়সা।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সেবার ক্ষেত্রে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ ধরনের ব্যাপক মূল্য বৈষম্য বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিটিআরসির মূল্যায়নে, একই বাজারে নিজস্ব ও সাধারণ ক্রেতার মধ্যে এমন মূল্য বৈষম্য প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর ধারা ১৫(১), (২), (৩) ও ধারা ১৬(১), (২), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ধারা ২৯(ঘ) ও ৫০(১) এবং আইটিসি লাইসেন্সিং গাইডলাইনের ৮.২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
এসব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে সামিট কমিউনিকেশনসকে প্রথম ৩ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। পরে জরিমানা মওকুফ ও পুনঃশুনানির আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে বিটিআরসির ২৯৭তম সভায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য উপপরিচালক মেহফুজ বিন খালেদকে পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এরপর বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইকবাল আহমেদকে তদন্ত ও শুনানি কার্যক্রম সম্পন্ন করে বিষয়টি নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ (সংশোধন-২০২৬)-এর ধারা ৬৫(৫) অনুযায়ী সামিট কমিউনিকেশনসের শুনানি গ্রহণ করে কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আল ইসলাম বলেন, বিটিআরসির পক্ষ থেকে প্রশাসনিক জরিমানা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তসংক্রান্ত কোনো অফিসিয়াল চিঠি তারা এখনো পাননি। তবে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর জরিমানা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করে শুনানিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের পক্ষে সব প্রাসঙ্গিক তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপরও যদি বিটিআরসি প্রশাসনিক জরিমানা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী আপিলসহ সব আইনগত প্রতিকার গ্রহণ করা হবে।’
আরিফ আল ইসলাম আরও দাবি করেন, নিজস্ব আইটিসি প্রতিষ্ঠান থেকে আইআইজিকে ব্যান্ডউইথ দেওয়া কোনো বাণিজ্যিক বিক্রি নয়; এটি একই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বরাদ্দ।
বিটিআরসির মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিকেশন উইংয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী বলেন, আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী একাধিকবার সামিট কমিউনিকেশন্সের সঙ্গে আলোচনা ও শুনানি হয়েছে। প্রতিবারই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, বিটিআরসির প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য পৃথক নীতিমালা রয়েছে এবং সে অনুযায়ী রাজস্ব ভাগাভাগির হারও আলাদা। আইটিসি কোম্পানিগুলোকে ৩ শতাংশ এবং আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ শতাংশ রাজস্ব দিতে হয়। একই নামে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে সামিট এই নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফারুক, চট্টলা২৪

