মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে অন্তত সাত হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা সংগ্রহের পর রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে ‘ব্যাটার লাইফ অর্গানাইজেশন’ নামে একটি কথিত এনজিও। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন শত শত গ্রাহক। প্রতারণার শিকার মানুষ এখন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সোমবার (২০ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে উপজেলার আলেকজান্ডার-রামদয়াল সড়কের পাশে রাজিয়া ভিলা ভবনে অবস্থিত এনজিওটির কার্যালয়ে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখতে পান গ্রাহক সিরাজ উদ্দিন। পরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সব নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শত শত গ্রাহক কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন, আবার কেউ কেউ প্রতারকদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জমকালো প্রচারণার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ‘আজকের উদ্যোগ, আগামীকালের নিশ্চয়তা’ স্লোগান সামনে রেখে সেলাই প্রশিক্ষণ, শিশু শিক্ষা, আত্মকর্মসংস্থান এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা হয়। পরে অল্প সময়ে বেশি মুনাফা এবং আকর্ষণীয় সঞ্চয় প্রকল্পের প্রলোভন দেখিয়ে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ শুরু করে তারা।
গ্রাহকদের জানানো হয়, এক লাখ টাকা জমা রাখলে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা মুনাফা দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় জমাকৃত অর্থ ফেরত নেওয়া যাবে। আবার সাত বছরের জন্য টাকা জমা রাখলে মূলধনের দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। এসব প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে মধ্যবিত্ত, নিম্ন আয়ের মানুষ, জেলে, কৃষক, দিনমজুর এবং নদীভাঙা উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য পরিবার তাদের সঞ্চয়ের টাকা সেখানে জমা রাখেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধন ছিল না। ভুয়া কাগজপত্র এবং আকর্ষণীয় প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে অর্থ সংগ্রহ করেছে। এক বছরের কিছু বেশি সময়ে প্রায় সাত হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত পাঁচ কোটি টাকা সংগ্রহের পর পুরো চক্রটি আত্মগোপনে চলে যায়।
ভুক্তভোগী আব্দুল হক ও শাহিনুর বেগম জানান, ঋণের আশ্বাস দিয়ে একেকজনের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে সঞ্চয় নেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে বেশি লাভের আশায় এক লাখ টাকা বা তারও বেশি জমা রেখেছেন। এখন অফিস বন্ধ, কর্মকর্তাদের ফোনও বন্ধ।
বিলকিস বেগম বলেন, ঋণ পাওয়ার আশায় স্বামীকে না জানিয়ে কষ্ট করে জমানো টাকা জমা রেখেছিলেন। এখন সেই টাকাও হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
আরেক গ্রাহক শারমিন আক্তার জানান, কাতারপ্রবাসী স্বামীর পাঠানো ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন। চলতি মাসে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি উধাও হয়ে যাওয়ায় তিনি নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগীরা প্রতারকদের দ্রুত গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের টাকা ফেরত নিশ্চিত করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো ভুক্তভোগী আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

