চট্টগ্রামের সিআরবিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব) মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) সংরক্ষিত বাংলোয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্ধারিত নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য সাদ্দাম হোসেনের।
অভিযোগ, রেলওয়ের তিন প্রকৌশলীর স্ত্রীদের অনুমতিপত্র যাচাই ও প্রবেশ নিবন্ধনে স্বাক্ষর করতে বলায় তাঁদের স্বামীদের ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন। পরে তাঁদের স্বামী রেলওয়ের তিন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী এসে দায়িত্বরত ওই সদস্যকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ঘটনার পরপরই কোনো লিখিত অভিযোগ বা বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই তাঁকে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি রেলওয়ের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, গত বুধবার (২৯ জুলাই) চট্টগ্রামের সিআরবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব) মহাব্যবস্থাপকের সংরক্ষিত বাংলোয় কয়েকজন নারী প্রবেশ করতে চান। জিএমের বাংলো একটি সংরক্ষিত স্থাপনা হওয়ায় সেখানে প্রবেশের জন্য পূর্বানুমতি, অনুমতিপত্র যাচাই এবং প্রবেশ নিবন্ধনে স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। এই প্রক্রিয়া রেলওয়ের নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি)-এর অংশ।
দায়িত্বে থাকা আরএনবি সদস্য সাদ্দাম হোসেন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আগত তিন জন নারীদের কাছে অনুমতিপত্র দেখতে চান এবং প্রবেশ নিবন্ধনে স্বাক্ষর করার অনুরোধ করেন। তবে এতেই ক্ষুব্ধহন ওই তিন নারী। এতে তাঁদের সাথে ‘বেয়াদপি’ করা হচ্ছে বলে ওই নারীরা বাক্বিতণ্ডা শুরু করেন। এক পর্যায়ে ওই নারীরাদের মধ্যে দুইজন রেলওয়েতে কর্মরত তিন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী স্বামীদের ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন।
তিন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীর একজন বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. রেজওয়ান-উল-ইসলাম এবং বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ) আবদুল্লাহ আল মাসুদ।
আরএনবির একাধিক সদস্যের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে পৌঁছেই তিন কর্মকর্তা দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীর ওপর ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা সাদ্দাম হোসেনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
আরও অভিযোগ, উপস্থিত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সামনেই কোনো লিখিত অভিযোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ বা বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই সাদ্দাম হোসেনকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড করা হয়।
আরএনবির একাধিক সদস্যের দাবি, এ সিদ্ধান্তে প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে রেলওয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর থেকেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁদের ভাষ্য, সংরক্ষিত সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করেও যদি একজন সদস্য অপমানিত হন এবং উল্টো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরএনবি সদস্যরা দায়িত্ব পালনে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
ভুক্তভোগী আরএনবি সদস্য সাদ্দাম হোসেন বলেন, “আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি। নিয়ম অনুযায়ী অনুমতিপত্র দেখতে চেয়েছি এবং প্রবেশ নিবন্ধনে স্বাক্ষর করতে বলেছি। এরপর আমার সঙ্গে অশোভন আচরণ করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বামীরা এসে আমাকে গালিগালাজ করেন। আমি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. রেজওয়ান-উল-ইসলাম বলেন, আপনারা সংবাদ করতে চাইলে করতে পারেন। এ বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দেব না।”
এছাড়া বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ) আবদুল্লাহ আল মাসুদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরএনবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনাটি ছোট পরিসরের হলেও একজন সরকারি কর্মকর্তার আচরণ আরও সংযত হওয়া উচিত ছিল। প্রয়োজনে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টির সমাধান করা যেত। দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সদস্যকে প্রকাশ্যে অপমান করায় বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা গেছে।”
ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আরএনবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমান্ডেন্ট সালামত উল্লাহ বলেন, ঘটনা জানার পর তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় তিনি সংশ্লিষ্ট কমান্ডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ঘটনাটি শুধু একজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ নয়, এটি সংরক্ষিত সরকারি স্থাপনায় নিরাপত্তা বিধি বাস্তবায়ন, দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের পেশাগত স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
তাঁদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।
ফারুক, চট্টলা২৪

