শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার উপকূলীয় শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
হাসপাতালে নেওয়ার পর ৫ জনের মৃত্যু
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চমেক হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা ভাটিয়ারীর বাসিন্দা নেজম উদ্দীন জানান, সংজ্ঞাহীন শ্রমিকদের উদ্ধার করে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে ঘটনাস্থলে এবং স্থানীয় ক্লিনিকে নেওয়ার পথে আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে সানি জলদাস (২২) ও পলাশ জলদাস (২৭)-এর পরিচয় শনাক্ত করা গেছে।
পিপিই, অক্সিজেন মাস্ক ও গ্যাস ডিটেক্টর না থাকার অভিযোগ
স্থানীয় শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে কোনো ধরনের পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), অক্সিজেন মাস্ক বা গ্যাস ডিটেক্টর ছাড়াই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছিল।
শুক্রবার সকালে একদল শ্রমিক স্ক্র্যাপ জাহাজে হাউজকিপিংয়ের কাজে যান। এ সময় একটি ট্যাংক থেকে তীব্র বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হতে থাকলেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা বা গ্যাসের মাত্রা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা।
গ্যাস নির্গমনের বিষয়টি দেখতে গিয়ে একের পর এক শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
ইয়ার্ডে গ্যাসের বিষাক্ততা পরীক্ষার জন্য সার্টিফায়েড সেফটি অফিসার কিংবা গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট তদারকির ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের তদারকিতে চরম গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ করেছেন নিহতদের স্বজন ও সহকর্মীরা। এমনকি দুর্ঘটনার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে গোপন করার চেষ্টা এবং তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি চিকিৎসাসেবার ঘাটতি ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজ দেখা দেয়। এ সময় স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন লোক বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন।
তার দাবি, এতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেছেন।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টার পর ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডের ঘটনায় আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্ত শুরু
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, “জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
ইয়ার্ডে ভাঙচুর, মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
দুর্ঘটনার পর নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ইয়ার্ড কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে স্থানীয় শতাধিক বিক্ষুব্ধ মানুষ ইয়ার্ডে গিয়ে ভাঙচুর চালান। এ সময় ইয়ার্ডের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
সাব্বির,চট্টলা২৪

