চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের ট্যাঙ্ক থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার উপকূলীয় শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ নিহত শ্রমিক হাবিবুর রহমানকে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মরদেহ চমেক হাসপাতালের লাশঘরে রাখা হয়েছে। নিহতের ছেলে মো. জিহাদ (১৫) হাসপাতালে উপস্থিত থেকে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে হাবিবুর রহমানের মৃত্যু হয়। ফলে চমেক হাসপাতালের লাশঘরে বর্তমানে ছয়জনের মরদেহ রয়েছে।
আহতদের চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা ভাটিয়ারীর বাসিন্দা নেজম উদ্দীন জানান, সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শ্রমিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন। একজন শ্রমিক চমেক হাসপাতালের ২ নম্বর ওয়ার্ডে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে ঘটনাস্থলে এবং স্থানীয় ক্লিনিকে নেওয়ার পথে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে সানি জলদাস (২২) ও পলাশ জলদাস (২৭) নামে দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজের অভিযোগ
স্থানীয় শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে কোনো ধরনের পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), অক্সিজেন মাস্ক বা গ্যাস ডিটেক্টর ছাড়াই শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করানো হচ্ছিল।
শুক্রবার সকালে একদল শ্রমিক স্ক্র্যাপ জাহাজে হাউজকিপিংয়ের কাজে যান। এ সময় জাহাজের একটি ট্যাঙ্ক থেকে তীব্র বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হতে থাকে। তবে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত বা আগাম সতর্কতার জন্য ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্যাস নির্গমনের বিষয়টি দেখতে গিয়ে একের পর এক শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন।
ইয়ার্ডে গ্যাসের বিষাক্ততা পরীক্ষার জন্য সার্টিফায়েড সেফটি অফিসার, গ্যাস ডিটেক্টর কিংবা গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট তদারকির ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের তদারকির ব্যর্থতা নিয়েও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় শ্রমিক ও স্বজনরা। তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি চিকিৎসাসেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ইয়ার্ডের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাঙ্কে লিকেজ দেখা দেয়। এ সময় স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন লোক বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন। এতে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
কুমিরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ আল মামুন বলেন, ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে স্থানীয়রা নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টার পর ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডের ঘটনায় আহত ছয়জনকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর দুপুর ২টা ২০ মিনিটে হাবিবুর রহমান নামে আরও একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গ্যাস নির্গমনের কারণ এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) অবহিত করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
সাব্বির, চট্টলা২৪

