গাড়ি চলেছে আট-নয় ট্রিপ, কিন্তু খাতায়-কলমে তেল উধাও ১৬ ট্রিপের! চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যেন রূপ নিয়েছে ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার এক উর্বর জমিনে। কাগজপত্রে ট্রিপ দ্বিগুণ দেখিয়ে অকাতরে তেল ইস্যু করা এবং তা কারচুপি করে পকেটে পুরার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে সাগরিকা পুলের দুই গাড়ি চালক- মোঃ শাহ আলম ও আব্দুল মাবুদের বিরুদ্ধে।
গাড়ির চাকা যতটুকু না ঘোরে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ঘোরে ‘তেল চুরির চাকা’ এমন অনিয়ম, দুর্নীতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে অসদাচরণের তথ্য সামনে আসার পর চসিকের নীতি নির্ধারকদের টনক নড়ে। মাননীয় মেয়রের নির্দেশে গত ১৩ জুলাই সচিবালয় বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে (স্মারক নং: ৪৬.১১.১৬০০.০০১.০৬.০৩৪.২৬-১১৭১) বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমে দায়িত্ব পান চসিকের অঞ্চল-০৫-এর তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব অভিষেক দাশ। আঞ্চলিক কর্মকর্তা অভিষেক দাশ ছুটিতে যাওয়ায় পরবর্তীতে আঞ্চলিক কর্মকর্তা বাবু রক্তিম চৌধুরীকে তদন্তের জন্য দেয়া হয়
নথিপত্র অনুযায়ী, আদেশের পর ৭ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগের জবাব দিতে বলা হলেও অভিযুক্ত চালকরা তা স্রেফ পাত্তা দেননি। সর্বশেষ তেল চুরির ঘটনায় শাহ আলমের কাছ থেকে গাড়ির চাবি ও নিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু রহস্যের জট সেখানেই শেষ নয়; অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে চালক ও পুলের খাতিরদারদের নিখুঁত মেলবন্ধনের গল্প।
এদিকে তদন্তের আদেশ দেওয়ার দিনই (১৩ জুলাই ২০২৬) উপ-সচিব স্বাক্ষরিত অপর এক অফিস আদেশে (স্মারক নং: ৪৬.১১.১৬০০.০১.৩১.০৩৪.২৬-১১৭২) অভিযুক্ত দুই চালককে সাগরিকা শাখা থেকে সরিয়ে দামপাড়া পুলে বদলি করা হয়েছিল। ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, সরকারি সেই অফিস আদেশকে স্রেফ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁরা সাগরিকাতেই বহাল তবিয়তে রয়ে যান। আদেশের এক মাস পেরিয়ে গেলেও দামপাড়া পুলে যোগ না দিয়ে নিজেদের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১২ই আগস্ট বুধবারে প্রতি ট্রিপে ৪ লিটার করে মোট ১৬ ট্রিপে ৬৪ লিটার তেল ইস্যু করা হয়েছিল। বাস্তবে গাড়ি চলেছে মাত্র ৮-৯ ট্রিপ। কিন্তু এই তেলের সাগর ঢালল কে?
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাগরিকার পুল সহকারী বাবু বাদল কান্তি দাশ ও পুলসহকারী রতন বাবু ১৬ ট্রিপ তেল ইস্যুর ব্যাপারে স্বীকার করেন।
কাগজে-কলমে তদন্তের মেয়াদ এক মাস আগেই শেষ। কিন্তু তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি কেন? জানতে চাইলে অঞ্চল-৫-এর বর্তমান আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা রক্তিম চৌধুরী জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এমন তেল মারার অভিযোগ আরও এসেছে। তবে লাল ফিতার দৌড় শেষ করে আগামী সপ্তাহের মধ্যে মেয়রের টেবিলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে এই ‘তেলখেকো’ সিন্ডিকেটের কারসাজি যে একেবারে নতুন নয়, তা স্পষ্ট চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, “অভিযোগগুলো আমিও পেয়েছি। এই চোরচক্র রুখতে কড়াকড়ি করায় আগে যেখানে ৮-৯ হাজার লিটার তেল খরচ হতো, তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ড্রাইভার শাহ আলমের পুরোনো ‘রেকর্ড’ আছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলেই সরাসরি অ্যাকশনে যাব, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
এদিকে বদলি আদেশ অমান্য করে সাগরিকায় থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী জানান, “মেয়র পরে তাদের নির্দেশ দেন সাগরিকা তে থাকার জন্য। তাঁদের সেই বদলি আদেশটি বাতিল করা হয়।”
অভিযোগের পাহাড় এবং চাবি বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে চসিক সচিব আশরাফুল আমিনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, বক্তব্য পাওয়ার জন্য অভিযুক্ত দুই চালক মোঃ শাহ আলম ও আব্দুল মাবুদের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও তাঁদের সাড়া মেলেনি।
নগরবাসীর করের টাকায় কেনা তেল এভাবে ‘উড়ে’ যাওয়া এবং এক সপ্তাহের তদন্ত এক মাসেও শেষ না হওয়া নিয়ে চসিকের অন্দরে এখন চাপা গুঞ্জন- তেলচুরির তদন্ত শেষ পর্যন্ত কি তেলের ওপরেই ভেসে থাকবে, নাকি চোরদের বিরুদ্ধে সত্যিই কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
ওমর ফারুক, চট্টলা২৪

