বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

মায়ের জন্য ইনজেকশন, দেওয়া হলো নবজাতককে! সিএসসিআরের গাফিলতিতে সংকটে নবজাতকের জীবন

আলোর মুখ দেখার কথা ছিল যে নতুন ভোরের, এক মুহূর্তের গাফিলতিতে তা ছেয়ে গেল অমাবস্যার ঘোর আঁধারে। জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যে প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে ট্রাস্ট আর আস্থার মূল্য আদায় করে, সেখানে কি না অপার অবহেলায় অঙ্কুরেই থমকে যাওয়ার পথে একটি তাজা প্রাণ! চিকিৎসাসেবার তথাকথিত ঝকঝকে দেয়াল আর পেশাদারিত্বের মেকি মুখায়বের আড়ালে চট্টলার বুকে গড়ে ওঠা সেন্ট্রাল স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (সিএসসিআর) কি সত্যিই আরোগ্য নিকেতন, নাকি অপরিপক্কতার এক চূড়ান্ত মৃত্যুফাঁদ- সেই প্রশ্নই এখন জনমনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ভুল চিকিৎসা আর চূড়ান্ত গাফিলতির চরম বলি হতে চলেছে সদ্য জন্ম নেওয়া এক নিষ্পাপ নবজাতক।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টায় সিএসসিআর হাসপাতালে জন্ম নেওয়া এক নবজাতকের শরীরে প্রসবপরবর্তী সময়ে মায়ের জন্য নির্ধারিত উচ্চমাত্রার সংবেদনশীল ইনজেকশন প্রয়োগ করার মতো এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞান ও নিরাপত্তার সব বলয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন হাসপাতালের নবাগত ও স্বল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নার্স শিফা আক্তার।

পরিবারের আকুল বারণ উপেক্ষা করে ইনজেকশন পুশ

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে নবজাতকের পিতা মো. হাসান অত্যন্ত ক্ষোভ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মা ও সদ্যোজাত সন্তানের রক্তের গ্রুপের অসঙ্গতি (Rh Incompatibility) জনিত জটিলতার কারণে প্রসবের পর নিয়ম অনুযায়ী মাকে একটি বিশেষ ইনজেকশন দিতে হয়। এর আগেও একই হাসপাতালে ওই প্রসূতির আগের দুই সন্তানের জন্মের সময় একই নিয়মে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। ফলে এটি মায়ের শরীরেই প্রয়োগ করার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানা ছিল পরিবারের।

কিন্তু বিপত্তির সূচনা ঘটে যখন কর্তব্যরত নার্স শিফা আক্তার ইনজেকশনটি নিয়ে প্রসূতির বদলে সরাসরি নবজাতকের দিকে এগিয়ে যান। মো. হাসান অভিযোগ করে বলেন, নার্স যখন শিশুটির শরীরে ইনজেকশন দিতে উদ্যত হন, তখন প্রসূতি মা নিজে এবং পরিবারের উপস্থিত স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বাধা দেন। প্রসূতি ও শিশুটির পিতা বারবার চিৎকার করে নার্সকে সতর্ক করে বলেন,“এই ইনজেকশন নবজাতকের নয়, এটি মায়ের শরীরে দেওয়ার ওষুধ!”

অথচ পরিবারের সেই আকুল আকুতি ও সরাসরি বারণকে তোয়াক্কাই করেননি ওই নার্স। উপস্থিত স্বজনদের চোখের সামনেই সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা তোয়াক্কা না করে একপ্রকার জোর জবরদস্তি করেই শিশুটির কোমল শরীরে সুঁচ ফুটিয়ে ইনজেকশনটি পুশ করে দেন নার্স শিফা আক্তার।

চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো ওষুধ দেওয়ার আগে ‘রাইট পেশেন্ট, রাইট ড্রাগ, রাইট ডোজ’ (সঠিক রোগী, সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা) যাচাই করা একজন নার্সের প্রাথমিক দায়িত্ব। পরিবারের পক্ষ থেকে সরাসরি নিষেধ করার পরও কীভাবে একজন রোগীর ওষুধ অন্য রোগীর শরীরে পুশ করা হলো- তা শুধু ভুল নয়, স্পষ্টতই অপরাধমূলক গাফিলতি।

দুই মাসের অভিজ্ঞতায় নবজাতকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি

ঘটনার সময় হাসপাতালে তিনজন চিকিৎসক- ডা. তুলি, ডা. নিপা ও ডা. নাদিরা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে স্বজনদের তোপের মুখে এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসকদের একজন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, অভিযুক্ত নার্স শিফা আক্তারের কাজের অভিজ্ঞতা মাত্র দুই মাস!

মাত্র দু’মাসের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং প্রশিক্ষণহীন একজন নার্সকে প্রসূতি ও নবজাতকের মতো সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিভাগে একা কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলো- তা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নবজাতকের পিতা মো. হাসান প্রশ্ন তুলে বলেন, “একজন অভিজ্ঞতাহীন নার্সকে দিয়ে কীভাবে এমন জীবন-মরণ দায়িত্ব পালন করানো হয়? আমার শিশুটি এখন বাঁচবে কি না, তা নিয়ে আমরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। এই ভুলের দায় কে নেবে? সিএসসিআর কর্তৃপক্ষ কীভাবে এর ক্ষতিপূরণ দেবে?”

অভিযুক্তকে ‘আড়াল’ করার প্রশাসনিক অপচেষ্টা

ভুল ইনজেকশন দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়া মাত্রই হাসপাতালে এক চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল স্বীকার করে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সিএসসিআর কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত নার্স শিফা আক্তারকে তড়িঘড়ি করে লুকিয়ে ফেলে। ক্ষুব্ধ স্বজনরা নার্সের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাকে সামনে আনা হয়নি। উল্টো পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সিএসসিআর হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মোরশেদুল করিম জানান, কনসালট্যান্ট চিকিৎসকের পরামর্শে নবজাতককে ১২ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত নার্সের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রশ্ন এখন সিএসসিআরের নড়বড়ে কাঠামোর বিরুদ্ধে

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন নার্সের ঘাড় থেকে দোষ চাপিয়ে দায় এড়াতে চাইলেও সচেতন মহল এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। চট্টগ্রামজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন- এটি কি শুধুই একজন তরুণী নার্সের ব্যক্তিগত ভুল, নাকি মোটা অঙ্কের ফি নেওয়া সিএসসিআরের ভুয়া ঝিলিক ও অদক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়ার নগ্ন রূপ? প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় সিএসসিআরের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের যে তদারকিহীন, জরাজীর্ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবস্থা বজায় রয়েছে, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুটির সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং সিএসসিআর কর্তৃপক্ষের কঠোর শাস্তির দাবিতে ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক ও নবজাতকের স্বজনরা সোচ্চার হয়েছেন।

ওমর ফারুক, চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া ‘কারাত-২০২৬’ উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন

যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর জাহাজ USS WARRIOR আজ রবিবার (০১-১১-২০২৬) চট্টগ্রাম...

বসুন্ধরায় ফ্ল্যাটে হামলা চালিয়ে লুটপাট, যুবলীগের শহিদুল পুলিশের জালে

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এল ব্লকের ৩৪ নং সড়কের...

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালির অভিযোগে বৃদ্ধের ২০ দিনের কারাদণ্ড

চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালির অভিযোগে মনজুর আলম (৬৫) নামে...

সড়ক নিরাপত্তায় হাটহাজারীর স্কুলছাত্রীদের সচেতনতামূলক কর্মশালা

চট্টগ্রামে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা হ্রাসে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে...