বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

শুল্কমুক্ত ২৩.৬ টন কাপড় উধাও, রাজস্ব ফাঁকি ১ কোটি ৩ লাখ টাকা

রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। তবে সেই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের মেসার্স সিটিজি ফোর ব্রাদার্স এ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সরেজমিন পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির ইনটু-বন্ড গুদামে থাকার কথা থাকা প্রায় ২৩ হাজার ৬৩২ কেজি আমদানিকৃত পলিয়েস্টার ওভেন ফেব্রিক্সের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

কাস্টমসের তদন্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় খালাস নেওয়া এসব কাঁচামাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ইনটু-বন্ড গুদামে প্রবেশ করানো হয়নি। বরং কাঁচামালগুলো কারখানার গুদামে না এনে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। কাস্টমসের হিসাবে, গায়েব হওয়া কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ১৫৭ টাকা। এতে সরকারের ফাঁকি দেওয়া শুল্ক-করাদির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৮২ টাকা।

ঘটনার তদন্তে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন উপ-কমিশনারের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি দল প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের সময় সুইং ও কাটিং সেকশনে উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকলেও চতুর্থ তলায় অবস্থিত একটি কাটিং ফ্লোর বন্ধ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ইনটু-বন্ড ওয়্যারহাউসে নথিতে উল্লেখ থাকা কাঁচামালের সঙ্গে বাস্তব মজুদের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে।

বিল অব এন্ট্রিতে ৮৭ বেল, গুদামে নেই কোনো রোল

কাস্টমসের তদন্ত নথি অনুযায়ী, অনুমোদিত বিল অব এন্ট্রি নম্বর ৬০৭৮৩৫-এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে ১০০ শতাংশ পলিয়েস্টার ওভেন ফেব্রিক্সের ৮৭ বেল বা ১৪৪ রোল খালাস নেওয়া হয়। নথিপত্রে ওই চালানের ওজন দেখানো হয়েছে প্রায় ২০ হাজার ৬৩২ দশমিক ২৩ কেজি।

কিন্তু সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির ইনটু-বন্ড ওয়্যারহাউসে তল্লাশি চালিয়ে ওই চালানের কোনো কাপড়ের রোল বা বেল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কাস্টমস। অর্থাৎ কাগজপত্রে কাঁচামাল আমদানি ও খালাসের তথ্য থাকলেও গুদামে তার বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এর বাইরে প্রতিষ্ঠানের সুইং ও কাটিং ফ্লোরেও আরও প্রায় ১২ হাজার পিস বা আনুমানিক ৭ হাজার ২০০ কেজি কাঁচামালের হিসাবের সঙ্গে অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। ইনটু-বন্ড ও আউট-বন্ড ওয়্যারহাউসের নথি এবং বাস্তব মজুদ পর্যালোচনা করে সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ হাজার ৬৩২ কেজি আমদানিকৃত কাঁচামালের ঘাটতি শনাক্ত করে তদন্ত দল।

পাঁচ দিনের মধ্যে গুদামে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা

বন্ড-সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল কাস্টমস স্টেশন বা বন্দর থেকে খালাসের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ইনটু-বন্ড ওয়্যারহাউসে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিলিজ অর্ডার জারির তারিখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে কাঁচামাল গুদামে প্রবেশ করাতে হয়।

কাস্টমসের তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, সিটিজি ফোর ব্রাদার্স এ্যাপারেলস ওই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাঁচামাল অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। বন্ড কমিশনারেটকে বিভ্রান্ত করতে ভুয়া গেট পাস ও পোর্ট এক্সিট-সংক্রান্ত অসত্য তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগও তদন্তে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পণ্য গুদামে না পৌঁছানোর কারণ হিসেবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অর্থ পরিশোধ না হওয়া কিংবা শিপিং এজেন্টের ডেলিভারি অর্ডার না পাওয়ার বিষয়টি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে কাস্টমসের অটোমেটেড সিস্টেম ও বন্দর এক্সিটের তথ্য যাচাই করে তদন্ত দল দেখতে পায়, সংশ্লিষ্ট পণ্য ইতোমধ্যে বন্দর এলাকা ত্যাগ করেছে। ফলে পণ্য খালাসের পর সরাসরি গুদামে না নিয়ে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

শুল্কমুক্ত কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল মূলত রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনে ব্যবহারের শর্তে শুল্ক-কর ছাড় পায়। এই কাঁচামাল দেশীয় বাজারে বিক্রি করা হলে তা বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

কাস্টমসের তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, সিটিজি ফোর ব্রাদার্স এ্যাপারেলসের গুদামে অনুপস্থিত প্রায় ২৩ হাজার ৬৩২ কেজি ওভেন ফেব্রিক্স বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হলেও তা স্থানীয় খোলাবাজারে সরিয়ে বিক্রি করা হয়েছে।

কাস্টমসের হিসাবে, গায়েব হওয়া কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার ১৫৭ টাকা। এর বিপরীতে কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আয়করসহ মোট ফাঁকিকৃত শুল্ক-করাদির পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৮২ টাকা।

৩০ দিনের মধ্যে জবাব, ব্যর্থ হলে লাইসেন্স বাতিল

ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারা এবং ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২৪-এর বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব দিতে ৩০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে অথবা জবাব সন্তোষজনক না হলে এবং ফাঁকিকৃত শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বন্ড লাইসেন্স বাতিলসহ চূড়ান্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের উপ-কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেন বলেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো রপ্তানিমুখী শিল্পকে সুবিধা দেওয়া, যাতে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। এই সুবিধা নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত কাঁচামাল এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দিলে ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, সিটিজি ফোর ব্রাদার্স এ্যাপারেলসের কাঁচামাল অবৈধ অপসারণের দায়ে ১ কোটি ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৮২ টাকা রাজস্ব আদায়ের জন্য কাস্টমস আইন অনুযায়ী নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে কিংবা নির্ধারিত সময়ে ফাঁকিকৃত শুল্ক ও জরিমানা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বন্ড লাইসেন্স বাতিলসহ আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘দোষী হলে ব্যবস্থা নিতে হবে’

বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিজিএমইএর পরিচালক সাইফুল্লাহ মনসুর। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একশ্রেণির অসাধু উদ্যোক্তা বন্ড সুবিধার আড়ালে দেশীয় বাজারে শুল্ক ফাঁকির কাঁচামাল ঢোকাচ্ছেন। এতে সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বদনামের ভাগীদার হতে পারেন না।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বন্ডের কাঁচামাল খোলাবাজারে চলে এলে দেশীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এতে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব হারায়। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে বন্ডেড ওয়্যারহাউসে নিয়মিত ও আকস্মিক ডিজিটাল অডিট চালু করা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শুধু শো-কজ নোটিশ দিয়ে বন্ড জালিয়াতি বন্ধ করা যাবে না। বন্দর বা বিমানবন্দর থেকে কাঁচামাল বের হওয়ার পর তা নির্ধারিত কারখানার গুদামে পৌঁছেছে কি না, সেটি নিশ্চিত করতে কাস্টমসের ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে কারখানার তথ্যভান্ডার যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কাঁচামাল পরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা হলে মাঝপথে পণ্য সরিয়ে ফেলার সুযোগ কমবে।

‘প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য’

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স সিটিজি ফোর ব্রাদার্স এ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি এখন কিছুই বলতে পারব না। আপনি বন্ডের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বেশ কয়েকবার বক্তব্য দেবেন বলেও দেননি।’

কাস্টমসের তদন্ত ও নোটিশের জবাব দেওয়ার পরই অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে।

ফারুক, চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

Guide pratique du cashback casino chez casinia

Le cashback peut réduire une partie des pertes, mais...

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আরও এক শিশুর মৃত্যু

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।...

চবি’র ছাত্রী হলগুলোতে ডিপ ফ্রিজ দিলেন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক পাঁচটি হলে ডিপ...

চুনতিতে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে রিফ্রেশ বাংলাদেশ

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি...