বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএনপি। বুধবার (৬ ই নভেম্বর) বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চাঁদাবাজির অভিযোগে কারণ দর্শানোর দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাউজান -রাঙ্গুনিয়ায় ফিরতে শুরু করে দীর্ঘদিন থেকে এলাকা ছাড়া হওয়া বিএনপি নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর ক্যাডাররা সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে যোগ দেয় উত্তর জেলা বিএনপির আহবায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের সাথে। বোল পাল্টে বিএনপির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি শুরু করে তারা। ক্ষতিগ্রস্তরা দুবাইয়ে অবস্থানরত বিএনপি নেতা গিয়াস কাদের চৌধুরীকে বিষয়টি অবহিত করেন। দেশে ফিরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে রাউজান রাঙ্গুনিয়ায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার রাজনীতি বন্ধ ও চাঁদাবাজির বিপক্ষে অবস্থান নেন গিয়াস কাদের চৌধুরী।
শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছোট ভাই গিয়াস কাদের চৌধুরীকে দলের এমন আকষ্মিক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়াকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে তৃণমূলে।
বিএনপির পক্ষ থেকে গিয়াস কাদেরের উদ্দেশে চিঠিতে বলা হয়, ”এলাকায় দলমত নির্বিশেষে ধনী ব্যবসায়ীর তালিকা করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়। ওমান বসবাসরত সিআইপি ব্যবসায়ী ইয়াসিন এর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে ইয়াসিনের রাউজানের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া। সিআইপি ব্যবসায়ী মো. ফোরকানের কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে সন্ত্রাসীদের দিয়ে ফোরকানকে নির্মম শারীরিক নির্যাতন, আপনার সন্ত্রাসীরা দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থানরত রাউজানের ব্যবসায়ীদের ওপর ঢালাও চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকাকে আতঙ্কের জনপদে পরিণত করা ইত্যাদির অভিযোগ জমা হয়েছে।”
তবে শোকজের চিঠি ইস্যুর পর সিআইপি ইয়াসিন তার বাড়ি জ্বালানোর সাথে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস কাদের চৌধুরীকে জড়ানোর বিষয়টিকে প্রকৃত ঘটনা আড়ালের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘ শহীদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সাথে রাউজান -রাঙ্গুনিয়ার প্রবাসীদের আত্নার সম্পর্ক -এটা সবারই জানা। সন্ত্রাসীরা, চাঁদাবাজদের কোন দল নেই। তবে তারা কোন নেতার আশ্রয় নিয়েছে সেটি তদন্ত করে দেখা উচিত বিএনপির। ‘
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের রাউজানে গত ৫ আগস্ট থেকে প্রতিনিয়ত হামলা লুট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা সাবেক সাংসদ গিয়াস কাদের চৌধুরীর দ্বারস্থ হন। ৫ থেকে ৮ই আগস্ট দুর্বৃত্তদের চাঁদাবাজি, ঘরে ঘরে হামলা ও লুটতরাজ থেকে রক্ষা পায়নি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি ও উপাসনালয়। এমনকি দূর্বৃত্তদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি রাউজানে কৃতি সন্তান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন স্মৃতি ভবনটি।এসকল ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা এসব ঘটনার পেছনে এক বিএনপি নেতার লোকজনকে অভিযুক্ত করলেও এসকল ঘটনার জন্য প্রধানত স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্তরা দায়ী, যাদের কোন দলীয় পরিচয় নেই৷
এরমধ্যে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও হামলা করে ঘর ভাংচুর, লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন পারভীন আক্তার নামে এক মহিলা। ঘটনাটি ৮ আগস্ট হলেও অভিযোগটি দায়ের করেন ৫ সেপ্টেম্বর। গত ৮ আগস্ট রাউজানে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও ঘরে ঢুকে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চীফ জুড়িলসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা অভিযোগটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত৷ মামলায় ৮/১০জনকে আসামী করা হয়।
রাউজান পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণপাড়ার এক সনাধন ধর্মালম্বী ভূক্তভোগী জানান, “৫ আগস্ট দিবাগত রাত ৩টার পর আমাদের বাড়িতে হামলা হয়৷ হামলাকারীরা শুধু যে হামলা কিংবা ভাংচ্যুর চালিয়েছে তা নয় তারা মূলত ব্যাপকহারে লুটপাট চালিয়েছে৷”
ভূক্তভোগী আরো বলেন, তিনদফা আমাদের বাড়িতে লুটতরাজ চালানোর পর তারা আমাদের পুকুরের মাছ পর্যন্ত লুটের চেষ্টা চালায়৷ এটা যদি রাজনৈতিক হামলা হতো তাহলে তারা আমার ঘর ভাংতো, আমার ছবি কিংবা পুরো ঘরটাই শুধু ভাংতো৷ কিন্তু তারা বাড়ির জিনিস পত্র লুট করে নিয়ে চলে গেছে৷ রান্নাঘরে থানা হলুদ, মরিচ, তেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাসের চুলাটিও ওরা নিয়ে গেছে৷ এমনকি বাথরুমে থাকা পানির বালতি ও এডজস্ট ফ্যান পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়৷ ৩য় দফা হামলাকারীরা এসে আমাদের উপসনালয় ভাংচ্যুর করেছে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে৷ তবে ঘণবসতি পূর্ণ এলাকা হওয়ায় সেটি করতে পারেনি৷”
রাউজান হলদিয়া বাঘমারা টিলা ইয়াসিন নগর এলাকার বাসিন্দা বলেন, “৫ তারিখ সরকার পতনের রাতেই ৩০/৪০ জনের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা মূলত ডাকাতির উদ্দেশ্যেই ঘরে প্রবেশ করেছিল। কারণ ওরা এসে আলমিরা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিল কিন্তু এক পর্যায়ে আমার আব্বুর পারিবারিক বেশ কিছু টাকার ব্যাগ পেয়ে গেলে তারা সেগুলো নিয়ে চলে যায়। রাত আনুমানিক ১০টার সময় সংঘটিত এই ঘটনার নেতৃত্বে স্থানীয় কিছু চিহ্নিত মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নেতৃত্ব দিয়েছিল বলে জানান এই ভূক্তভোগী৷
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্থানীয় সংসদ ফজলে করিম চৌধুরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থরের জনপ্রতিনিধিদের বসরবাড়ি থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ৷ প্রায় প্রতিদিনই বিচ্ছিন্ন ভাবে হামলা, লুটের ঘটনা ঘটলেও বেশীর ভাগ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা নীরব ভূমিকা পালন করছে৷ বর্তমানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বেশীর ভাগই এলাকা ছাড়া৷
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, “আসলে এমনটা হলে কখনো কল্পনাও করিনি৷ সন্ত্রাসীদের কবল থেকে নিজেদের ও নিজ নিজ পরিবারের জানমাল রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবারের সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্থরা প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে। ‘

