বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, এলাকায় নিজের সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন স্কুল শিক্ষিকা হাসিনা মমতাজ। ৪ঠা আগস্ট নিউ মার্কেট চত্বরে হামলার শিকার হয়েছিলেন হাসিনা মমতাজের স্বামী। কিন্তু ৫ই আগস্ট পট পরিবর্তনের সুযোগে একটি পক্ষ মোহরা ছায়েরা খাতুন কাদেরিয়া স্কুল এন্ড কলেজ থেকে প্রধান শিক্ষিকা হাসিনা মমতাজকে তাড়ানোর পরিকল্পনা করেন।
প্রতিবেদকের হাতে আসা ফেসবুক ও ওয়ার্ডসআপ চ্যাটে দেখা যায়, হাসিনা মমতাজকে পদত্যাগ করানোর জন্য ছাত্রী যোগাড় করছে কিছু যুবক। স্কুল থেকে পাস করা কোন এক ছাত্রীকে স্কুল প্রাঙ্গণে আসার জন্য বলছেন ওই যুবক। এসময় ওই ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করতে দেখা যায়, অন্য ছাত্রীরা যাবে কিনা, কতজন যাবে? কতজনকে ম্যানেজ করা যাবে?
হাতে আসা অডিও বার্তায় ছাত্রীদের ক্যাম্পাসে ঢুকার আগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতে শোনা যায় একজনকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই স্কুলে বহিরাগতদের একটি গ্রুপ হাজির হয়ে প্রধান শিক্ষিকার পদত্যাগ দাবি করেন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শোনা যায় কয়েকজনকে। স্কুলে ডুকেই বহিরাগত গ্রুপটি স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। পাঠদান কক্ষ ভাংচুর করে। ক্লাসরুম থেকে ছাত্রীদের অন্য একটি রুমে জড়ো করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শি এক অভিভাবক জানান, ‘ বহিরাগত যুবকটা স্কুলের ছাত্রী ও শিক্ষকদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। তাদের মুঠোফোন চেক করেন। ‘
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে স্কুলের দাতা সদস্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো। ওই বিএনপি নেতার পরিবারের অন্য সদস্যদের দাবি স্কুল প্রতিষ্ঠায় তার কোন জমি ছিলো না। সে কারণে তাকে দাতা সদস্য ও স্কুলের পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেয়া হয়েছিলো। ৫ই আগস্ট সরকারের পদত্যাগের পর স্কুল দখল করার পরিকল্পনা করেন ওই বিএনপি নেতা। পরিকল্পনা অনুযায়ী একজন ছাত্রকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সাজিয়ে প্রধান শিক্ষিকার পদত্যাগের দাবি তোলেন। পরে প্রধান শিক্ষিকা পদত্যাগ করেছেন এমন গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি সরকারের সময় দলের সুবিধাভোগী হলেও ২০১৪ সালের পর থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় নন ওই বিএনপি নেতা। বিএনপির রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে জাতীয় যক্ষা সংস্থা (নাটাব) চট্টগ্রামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আন্জুমানে মফিদুল ইসলাম চট্টগ্রামের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছেন এমন নথিও মিলেছে অনুসন্ধানে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশ কর্মকর্তা সাবেক সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়ের হাতে অর্থ তুলে দেবার একাধিক ছবিও পাওয়া গেছে ওই নেতার। কিন্তু সরকার পদত্যাগ করার সাথে সাথেই নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লাগেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজের লোকজন নিয়ে ছায়েরা খাতুন কাদেরিয়া স্কুল ও কলেজ থেকে প্রিন্সিপাল হাসিনা মমতাজকে তাড়ানোর পুরো পরিকল্পনা ওই বিএনপি নেতার। চট্টগ্রামে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গণহত্যার উষ্কানি দেবার অভিযোগ এনে বুধবার (৪ ঠা আগস্ট) সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, শিক্ষামন্ত্রী নওফেল, বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ২৮ সাংবাদিকসহ ১০৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন প্রিন্সিপাল ‘হাসিনা মমতাজ ‘।
মামলাটির আইনজীবী রেজাউল করিম জানান, হাসিনা মমতাজের বাবা সৈয়দ আবুল হাসেম কোতোয়ালি থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। একযুগের বেশি সময় তিনি কোতোয়ালি থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে সিডনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক।
সুত্রমতে, সাংবাদিকসহ গণহত্যায় উষ্কানিদাতা, ছাত্র আন্দোলনে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে পেরে স্কুলে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সেই চক্রে নেতৃত্ব দেন ওই বিএনপি নেতা ( নাটাবের সভাপতি) ।
এদিকে, ‘ স্কুল ক্যাম্পাসে গিয়ে হট্টগোল সৃস্টি করার পর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ‘হাসিনা মমতাজ’। করেছেন কোর্ট জিডিও। স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরা ও বিভিন্ন কক্ষে ভাংচুর করার লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, স্কুলের সম্পদ নস্ট করার কাজ কখনোই ইতিবাচক কিছু নয়। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করা হোক। আমার ছাত্রীদের মোবাইল নিয়ে চেক করা, শিক্ষিকাদের মোবাইল নিয়ে নেয়া -এগুলো ফৌজদারি অপরাধ। ‘
মোহরা সাহেরা খাতুন কাদেরিয়া স্কুল এন্ড কলেজের এক শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রিন্সিপাল ম্যাডাম শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। সমস্যাটা আসলে ‘পরিচালনা পর্ষদ’ দখল নিয়ে। পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে ইতিমধ্যে সরিয়ে দিয়ে নতুন সভাপতি ( অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার) দেয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে বহিরাগতদের ব্যবহার করে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিলো। কিছু শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে আনা হয়েছিলো। পরে জানা যায় তারা আন্দোলনের সাথে জড়িত কেউ নয়। ‘
গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন , ‘ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে পদায়ন ও নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। ‘
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অরাজকতা সৃস্টির বিরুদ্ধে হুশিয়ারিও উচ্চারন করেন শিক্ষা উপদেষ্টা। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকে স্পষ্ট বার্তাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই যেন ঠেকানো যাচ্ছে না দখলের মহোৎসব।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে প্রশাসন ভেঙ্গে পড়তে পারে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পেতে অসুবিধা হবে। সে কারণে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।’
ছাত্র জনতার গণহত্যারের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটে। পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলে মরিয়া হয়ে উঠে একটি চক্র। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদত্যাগ চেয়ে করা আন্দোলনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সাথে ছাত্রলীগ -যুবলীগের নেতাকর্মীরদেরও অংশ নিতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অর্থের বিনিময়ে ভাড়া নেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কোন পক্ষের স্বার্থের গুঁটি হয়ে ব্যবহৃত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রামের সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগ করানো কোন ছাত্রের শোভা পায় না। অনিয়মের সাথে কেউ জড়িত থাকলে সেটি প্রশাসন দেখবে। তদন্ত করে শিক্ষাবোর্ড কিংবা জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। ‘
শিক্ষক পদত্যাগের নামে সারা দেশে যা হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ায় হচ্ছে সেটা সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মোজাহিদুল ইসলাম।
চট্টগ্রামের পটিয়া আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পীযুষ কান্তি পালকে প্রধান শিক্ষকের রুমে আটকে রেখে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। পরে সেই পটিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ২১ শে আগস্ট হাটহাজারীর চারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় শিক্ষার্থীরা। ২৭ শে আগস্ট ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় বিক্ষোভ। এভাবে চট্টগ্রামের ৫৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের উপর চড়াও হতে দেখা যায় বহিরাগতদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিএনপি-জামাতপন্থী পরিচালনা পর্ষদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলে নেবার চেষ্টা করেছে ।

