দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত এক বছরে চট্টগ্রামের শিল্পখাতে নেমে এসেছে অস্থিরতা। পোশাক, ইস্পাত, শিপ ব্রেকিং, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খাতের মোট ৫০টি কারখানা স্থায়ীভাবে এবং ৬৭টি কারখানা অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসব কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় ৫১ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন।
শিল্প পুলিশের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া ৫০টি কারখানায় কর্মরত ছিলেন ৮ হাজার ৭৪৩ জন শ্রমিক, আর অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকা ৬৭টি কারখানায় ছিলেন প্রায় ৪৩ হাজার শ্রমিক।
আর্থিক সংকট, এলসি জটিলতা ও অর্ডার কমে যাওয়াই মূল কারণ
শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আর্থিক সংকট, ঋণের চাপ, ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, এলসি জটিলতা, কাঁচামালের ঘাটতি ও অর্ডার কমে যাওয়াই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকরা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করেছেন। তবে অনেক কারখানা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।”
২২টি পোশাক কারখানা বন্ধ
গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২২টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই বন্ধ হয়েছে ১১টি পোশাক কারখানা।
শিল্প পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, কাজের অর্ডার না থাকা এবং মালিকদের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেই এই বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বিজিএমইএ’র পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন,
“বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ফ্যাক্টরি বায়িং হাউস নির্ভর ছিল, তারা টিকে থাকতে পারেনি। মার্কিন ট্যারিফের কারণে অর্ডারও কমে গেছে। ব্যাংকে এলসি খোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক উদ্যোক্তা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।”
ইপিজেডে চারটি কারখানা বন্ধ
চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) নাসা গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানসহ চারটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এসব প্রতিষ্ঠান হলো — টয় উড (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড, এমএনসি অ্যাপারেলস লিমিটেড, থিয়ানিস অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড।
এই চার কারখানায় ৪,৮১৮ জন শ্রমিক কাজ করতেন।
নাসা গ্রুপের কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে — ব্যাংক জটিলতা, আর্থিক সংকট ও অর্ডার না থাকা।
থিয়ানিস অ্যাপারেলস ও জেএমএস গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে মালিকের আর্থিক সংকটের কারণে।
বন্ধ আরামিট গ্রুপের তিন কারখানা
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আরামিট গ্রুপের তিনটি কারখানা—
আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড, আরামিট ফুটওয়্যার এবং আরামিট পাওয়ার লিমিটেড—চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও সেপ্টেম্বর মাসে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আর্থিক অসচ্ছলতা ও কাঁচামাল সংকট।
শিপ ব্রেকিং খাতে বিপর্যয়
গত এক বছরে ১৩টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও স্টিল মিল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহ-সভাপতি ও পিএইচপি ফ্যামিলির এমডি জহিরুল ইসলাম রিংকু বলেন,
“হংকং কনভেনশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২৬ জুনের মধ্যে সব ইয়ার্ডকে গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তর করতে বলা হয়েছিল। মাত্র ১৭টি ইয়ার্ড তা করতে পেরেছে, বাকিদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও জানান,
“জাহাজ আমদানি কমে গেছে। জুন-জুলাইয়ে সীমিত পরিমাণে জাহাজ আনা হলেও আগস্ট থেকে নতুন কোনো এনওসি দেওয়া হয়নি। ব্যাংকগুলো এলসি দিতে পারছে না, ঋণও বন্ধ। ফলে শিপইয়ার্ডগুলো কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।”
শ্রমিক অসন্তোষে উত্তাল শিল্পাঞ্চল
গত এক বছরে চট্টগ্রামের ৭০টি কারখানায় ৩১৫ বার শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে সর্বশেষ ১৪ ও ১৫ অক্টোবর প্যাসিফিক গ্রুপের কয়েকটি কারখানায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়।
শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে সেসব কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলেও, পরে গত বৃহস্পতিবার থেকে উৎপাদন পুনরায় শুরু হয়।
চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে এভাবে ধারাবাহিকভাবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত।
বিশেষ করে গার্মেন্টস, ইস্পাত ও শিপ ব্রেকিং খাত—যেগুলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল উৎস—সে খাতেই যদি সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এর প্রভাব পুরো দেশের কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় ব্যবস্থার ওপর পড়বে।
জুনায়েদ/চট্টলা২৪

