চট্টগ্রাম নগরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথমবারের মতো আধুনিক জৈব কীটনাশক বিটিআই (ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) ব্যবহার শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। তবে এই ওষুধ কেনাকে কেন্দ্র করে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার এ ওষুধ সরবরাহ করেছে ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল, যার মালিক ছিলেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীক।
চসিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের আগস্টে ই-জিপির মাধ্যমে বিটিআই সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে চট্টগ্রামের ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল এবং ঢাকার মেসার্স আহসানিয়া ইন্টারন্যাশনাল অংশ নেয়।
দরপত্রে আহসানিয়া ইন্টারন্যাশনাল কম দর দিলেও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় তাদের প্রস্তাব বাতিল করা হয়। পরে যোগ্য বিবেচনায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার দর দেওয়া ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলকে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ২০০ ইউনিট (১ হাজার ১০০ কেজি) বিটিআই সরবরাহ করে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে নগরে এ ওষুধের ব্যবহার শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর নতুন করে আলোচনা
সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচ কর্মকর্তা মশা নিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা সফরের অনুমতি চেয়েছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রস্তাব নাকচ করে মন্তব্য করেন, মশা নিধনের কৌশল শিখতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; দেশের কোনো ডোবার পাশেই দাঁড়ালেই বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব।
পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, প্রস্তাবিত ওই সফরের অর্থায়ন করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত বিটিআই-ই ফরাস পেস্ট কন্ট্রোলের মাধ্যমে কিনেছিল চসিক। এরপর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
চসিকের ব্যাখ্যা
চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঢাকায় অতীতে বিটিআই কেনায় জালিয়াতির ঘটনা ঘটায় তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
তিনি জানান, ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত স্থানীয় এজেন্ট হওয়ায় এবং সব শর্ত পূরণ করায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ফারুক–ই–আজমের নামে থাকলেও উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্ব অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন।
স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেন, সরকারি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সরকারি দরপত্রে অংশ নেওয়াই উচিত হয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে।
তাঁর ভাষায়, ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল আগে কখনও চসিকে মশার ওষুধ সরবরাহ করেনি। কিন্তু ফারুক–ই–আজম উপদেষ্টা হওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ফারুক–ই–আজমের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে ফারুক–ই–আজম বীর প্রতীক বলেন, ফরাস পেস্ট কন্ট্রোল তাঁর প্রতিষ্ঠান হলেও উপদেষ্টা হওয়ার আগেই তিনি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়ান।
তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান যদি উপদেষ্টা থাকাকালে চসিকে ওষুধ সরবরাহ করে থাকে, তাহলে তা সম্পূর্ণ নিয়মনীতি মেনেই করেছে। এতে তিনি কোনো স্বার্থের সংঘাত দেখছেন না।
আগের সরকারের আমলেও ছিল অনিয়মের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও চসিকে মশার ওষুধ কেনায় অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০১৯ ও ২০২২ সালে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৭৫ লাখ টাকার ওষুধ কেনা হয়। ওই ওষুধ সরবরাহ করেছিল নগর ছাত্রলীগের তৎকালীন এক নেতার প্রতিষ্ঠান।
এছাড়া ২০২৪ সালের শুরুতে সরকারি ক্রয়বিধির ৭৬(ট) ধারা ব্যবহার করে কেনাকাটাকে একাধিক ছোট লটে ভাগ করে ওষুধ কেনার অভিযোগও রয়েছে, যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাব্বির, চট্টলা২৪

