বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশনে। আগের রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। দুপুর গড়াতেই নগরের বিভিন্ন প্রান্তে জড়ো হতে শুরু করেন তারা।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ষোলশহরে আসার আহ্বান জানানো হয়। সেই সময় পথে থাকা এক নেতাকে ফোন করেন ওয়াসিম আকরাম।
‘ভাই, আপনি কই?’
উত্তরে জানানো হয়, তিনি মির্জাপুলের কাছাকাছি। ওয়াসিম তখন সতর্ক করে বলেন, ষোলশহর রেলস্টেশনে নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি ও তার লোকজন অস্ত্রসহ অবস্থান নিয়েছে। তাই সেখানে এখনই না যাওয়াই ভালো।
ওয়াসিম তখন শিক্ষা বোর্ডের দিকে অবস্থান করছিলেন। তিনি জানান, কলেজ ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে আছেন। মিছিল শুরু করার আগে কোথায় অবস্থান নেওয়া হবে জানালে তিনি সেখানে যোগ দেবেন।
এরপর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। চারদিকে তখন উত্তেজনা। ষোলশহরের ২ নম্বর গেট ও মুরাদপুর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কাছে সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। পুলিশের তল্লাশিও চলছিল বিভিন্ন মোড়ে।
সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের ভয় পেতে দেখে তাদের সাহস জোগান ওই নেতা। বলেন, রাজপথের যাত্রা কাউকে না কাউকে শুরু করতেই হবে। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, মিছিল হবে।
এর কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মিজান জানান, ওয়াসিম ফোন করেছেন। তিনি আসছেন। কিছুক্ষণ পর ওয়াসিম মুরাদপুরে পৌঁছান। তবে সঙ্গে থাকা আরও দুই ছোট ভাইকে নিয়ে আসার কথা বলে আবার কিছু সময়ের জন্য সরে যান।
মিছিল শুরু করা নিয়ে তখনও দ্বিধা ছিল। তিন দিকেই সশস্ত্র অবস্থান। কেউ কেউ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুরাদপুর মোড়ের ওপর থেকেই স্লোগান শুরু হয়—‘মেধা না কোটা’।
স্লোগান শুরু হতেই আশপাশ থেকে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দুই দিক থেকে হামলা চালালে আন্দোলনকারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একদল শিক্ষা বোর্ডের দিকে যায়, অন্যদল মুরাদপুর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দিক থেকে আসা হামলাকারীদের প্রতিরোধ করে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ২ নম্বর রেলগেটের দিকে ধাওয়া করে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়।
এর মধ্যেই খবর আসে, মির্জাপুলের দিক থেকে আরেকটি দল মুরাদপুরের দিকে এগিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। আবারও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে সশস্ত্র হামলাকারীরা পিছু হটে।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ২ নম্বর গেট থেকে গুলি করতে করতে শিক্ষা বোর্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—এমন খবর আসে। এ সময় আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর মধ্যেই ওয়াসিমের সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীদের একাংশ শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে মুরাদপুর-মির্জাপুল এলাকায় প্রতিরোধে ছিলেন আরও অনেকে।
কিছুক্ষণ পর খবর আসে—ওয়াসিম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
আহত ওয়াসিমকে কয়েকজন মিলে রিকশায় করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার চিকিৎসার খোঁজ নিতে বিভিন্নজনকে ফোন করা হয়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর আসে আরও ভয়াবহ খবর। ওয়াসিম আর নেই।
প্রথমে কেউই বিশ্বাস করতে পারেননি। এমনকি ফোনে ওয়াসিমের খোঁজ নেওয়া হলে জানানো হয়, তার চিকিৎসা চলছে। পরে আবার ফোন করলে ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘ভাই, প্রথমবার আপনার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছি। ওয়াসিম মারা গেছে।’
খবরটি শুনে যেন ভেঙে পড়েন তার সহযোদ্ধারা। মুরাদপুরের রাজপথে দাঁড়িয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। কিন্তু পরিস্থিতি তখনও থামেনি। চারদিকে সংঘর্ষ চলছিল। সহযোদ্ধাদের বলা হয়, কেউ যেন অবস্থান ছেড়ে না যায়।
পরে কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান তিনি। সেখানে তিনটি মরদেহ পড়ে ছিল। ড্যাব নেতা ডা. মেহেদী হাসান ইঙ্গিত করে জানান, মাঝখানের মরদেহটি ওয়াসিমের।
নিজেকে আর সামলাতে পারেননি তিনি। প্রিয় ছোট ভাইয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আশপাশের মানুষজনও সেই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ওয়াসিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল শুধু রাজনৈতিক সহযোদ্ধার নয়। নিজের কোনো ছোট ভাই না থাকলেও ছাত্র রাজনীতির পথচলায় ওয়াসিমসহ কয়েকজনকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবাসতেন তিনি। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ওয়াসিম তার পরামর্শ নিতেন।
তার ভাষায়, ‘শহীদ ওয়াসিম ছাত্রদলের একজন নিবেদিত প্রাণ ছিল। তাকে হারিয়ে আমরা হারিয়েছি এক দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে। ছাত্রদল হারিয়েছে একজন সত্যিকারের ছাত্রনেতাকে। বাবা-মা হারিয়েছেন পরিবারের আশার দিশাকে। আর আমি হারিয়েছি আমার স্নেহের ছোট ভাইকে।’
১৬ জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত রাজপথে ওয়াসিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নকে থামিয়ে দেয়নি; রেখে গেছে এক সাহসী প্রতিরোধের স্মৃতি। যে প্রতিরোধের শুরু হয়েছিল একটি ফোনকল দিয়ে—
‘ভাই, আপনি কই?’
আর শেষ হয়েছিল এক শহীদের রক্তে লেখা সেই আহ্বানে—
‘চলে আসুন ষোলশহর।’
সাব্বির, চট্টলা২৪

