প্রাথমিক সর্বসাধারণের প্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে তোলা ১৫ কোটি টাকার তহবিল ব্যবহারে চরম অনিয়ম ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণের তথ্য বেরিয়ে এসেছে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন লিমিটেডের বিরুদ্ধে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কাজ শেষ করতে পারেনি কোম্পানিটি। এমনকি বিএসইসির অনুমতি ছাড়াই মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সময় বাড়ানোর সেই আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ফেমেস অ্যান্ড আর’ (FAMES & R) কতৃক সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২০ সালের আগস্ট মাসে বিএসইসির অনুমোদন পেয়ে আইপিওর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা তোলে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন। ব্র্যাক ব্যাংকের একটি পৃথক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা হয়। প্রসপেক্টাসের শর্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবরের মধ্যে সকল অর্থের সঠিক ব্যবহার সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বারবার আবেদন করেও শেষ রক্ষা হয়নি কোম্পানির, কারণ তাদের আবেদন বিএসইসি আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দিয়েছে।
আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়ে শুরু থেকেই অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন। আইপিও ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিবর্তে ২০২০ সালের নভেম্বরে তারা এনআরবিসি ব্যাংকে ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা এফডিআর হিসেবে জমা রাখে। পরবর্তীতে তা ভেঙে নিজস্ব ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য ফান্ডে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সমন্বয় দেখানো হয়। নিজেদের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ খরচ করে পরে তা আইপিও ফান্ড বা এফডিআর ভাঙানো অর্থ দিয়ে সমন্বয় দেখানোর মতো জটিল ও সন্দেহজনক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
আইপিও ফান্ডের ব্যবহারে কোম্পানির দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মারাত্মক গরমিল দেখা গেছে। নতুন শেড নির্মাণ, নতুন যন্ত্রপাতি কেনা এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধের খাতে সংগৃহীত অর্থ ব্যয় করার কথা থাকলেও সেখানে বিল পরিশোধ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। নতুন প্ল্যান্ট এবং যন্ত্রপাতির জন্য ‘প্রোগ্রেসিভ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন’-এর সঙ্গে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকার বেশি চুক্তি হলেও গত বছরের শেষ পর্যন্ত সেখানে ৬৩ লাখ টাকার বেশি বকেয়া রাখা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা এবং ফান্ডের টাকা ঘুরিয়ে এফডিআর বা নিজস্ব অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আমানতের ওপর স্পষ্ট আঘাত।
বিএসইসির কাছ থেকে সময় বাড়ানোর দ্বিতীয় দফার আবেদন প্রত্যাখ্যানের পরও প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৪ লাখ ১১ হাজার টাকা ব্র্যাক ব্যাংক ও কোম্পানির নিজস্ব অ্যাকাউন্টে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা না মেনে তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার এমন কৌশলে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
২০২৪ সালে ১৭ কোটি টাকা মুনাফা করলেও মাত্র ১ কোটি টাকা লভ্যাংশ ঘোষণা প্রতিষ্ঠানটির:
সময়টা ২০২৪ সালের জানুয়ারি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৭.৪৬ কোটি টাকা মুনাফা করা সত্ত্বেও শেয়ার হোল্ডারদের জন্য নগদ লভ্যাংশ হিসেবে মাত্র ১.১ কোটি টাকা ঘোষণা করে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ। যা মুনাফার প্রায় ৬ শতাংশ।
তখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জানায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চট্টগ্রাম-ভিত্তিক কোম্পানিটির প্রায় ১১ কোটি শেয়ার রয়েছে। ২০২৩ অর্থবর্ষের জন্য কোম্পানিটি মাত্র ১% নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেন ১০% নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে। ২০২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটির রাজস্ব পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০% হ্রাস পেয়ে ৪৮.১১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং মুনাফা কমেছে ৫%।
সেসময় বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, লভ্যাংশ প্রদানটি অযৌক্তিক, কারণ কোম্পানিটি লাভের সিংহভাগ নিজের কাছে রেখে তার বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করছে।
সোহাইল, চট্টলা২৪

