চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) একটি আবাসিক ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল হওয়ার পরও সেই ফ্ল্যাট থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে চসিকের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। একই ব্যক্তির সরকারি দায়িত্ব পালন, কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাব সংরক্ষণ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে বসবাসের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে তদন্ত ও উচ্ছেদ অভিযানের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে চসিক কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন স্বাস্থ্য সহকারী (ইপিআই কর্মী) সেলিম ভুঁইয়া ২০২৩ সালের ৫ জুন অক্সিজেন সিটি করপোরেশন কোয়ার্টারের ষষ্ঠ তলার একটি টাইপ-ই ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির মূল্য ছিল ২৮ লাখ টাকা। বরাদ্দ নেওয়ার সময় তিনি ৫ লাখ টাকা জমা দেন। বাকি ২৩ লাখ টাকা পরিশোধের শর্তে ফ্ল্যাটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই তিনি নিজে সেখানে না থেকে ফ্ল্যাটটি ‘তমা’ নামের এক নারীর কাছে ভাড়া দেন। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই ফ্ল্যাট থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করে আসছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
চসিক সূত্রে জানা যায়, বকেয়া ২৩ লাখ টাকা পরিশোধ না করায় ২০২৬ সালের ২৬ জুন সেলিম ভুঁইয়াকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও তিনি টাকা পরিশোধ না করায় পরবর্তীতে ফ্ল্যাটটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়। এর ফলে ওই ফ্ল্যাটের ওপর তাঁর মালিকানার অধিকারও শেষ হয়ে যায়।
তবে জানা যায়, ভাড়াটিয়া তমা এখনো ওই ফ্ল্যাটেই বসবাস করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তমা বলেন, “আমি সেলিম ভাইয়ের কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিয়েছি এবং তাকেই ভাড়া দিই।”
তবে মাসিক ভাড়ার পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি তা বলতে রাজি হননি। তাঁর ভাষ্য, “ভাড়ার পরিমাণ সেলিম ভাইয়ের কাছ থেকেই জেনে নিন।”
চসিকের এস্টেট বা রাজস্ব শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “সেলিম ভুঁইয়ার ফ্ল্যাটটির বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। আমরা উচ্ছেদ অভিযান চালাব।” তিনি আরও স্বীকার করেন, এখনো পর্যন্ত ওই ফ্ল্যাট থেকে সেলিম ভুঁইয়াই ভাড়া আদায় করছেন বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে, যদিও তাঁর বরাদ্দ বাতিল হয়েছে।
অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন
সেলিম ভুঁইয়ার মূল পদ স্বাস্থ্য সহকারী (ইপিআই কর্মী)। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি হিসাব বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্বে হিসাব সহকারী হিসেবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের কর্তনকৃত অর্থ সময়মতো লেজারে পোস্টিং না করে বছরের পর বছর ফাইল জমিয়ে রাখা হয়। এতে অনেক কর্মচারী অবসরে যাওয়ার সময় তাঁদের প্রাপ্য অর্থ তুলতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির মুখে পড়েন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ন কবির চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ব্যপারে জানতে চাইলে চসিক সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, “এ ব্যাপারে আমরা ব্যবস্থা নেব। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারেও অনিয়মের অভিযোগ
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে সেলিম ভুঁইয়া আগ্রাবাদের সিডিএ ২২ নম্বর সড়কে অবস্থিত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে বসবাস করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই কোয়ার্টারগুলোতে বসবাসকারীদের কাছ থেকে প্রথম শ্রেণির বেতন স্কেল অনুযায়ী বাসাভাড়া আদায় করার নিয়ম থাকলেও সেলিম ভুঁইয়ার কাছ থেকে তৃতীয় শ্রেণির বেতন স্কেল অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগও উঠেছে। জানা যায়, সেলিম ভুইয়া সেসব কোয়ার্টারেও সাবলেট দিয়ে রেখেছে। তবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যা বললেন সেলিম ভুঁইয়া
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম ভুঁইয়া বলেন, “আমি ওই অক্সিজেনের ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা নিই না। ভাড়ার টাকা আদালত নিচ্ছে।”
তবে আদালত কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় ওই ভাড়া গ্রহণ করছে- এ বিষয়ে তিনি কোনো নথি বা বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেননি।
প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে তাঁর বসবাস এবং ভাড়া নির্ধারণের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, “অন্যান্য অফিসার্স কোয়ার্টারেও তো আরও নানা ঝামেলা রয়েছে।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে চসিকের তদন্ত ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের দিকে এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।
ফারুক, চট্টলা২৪

