রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর সভায় ডেলিগেট কার্ড বিতর্ক, ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ

দলের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে রাজপথে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণের জন্য বিতরণ করা ডেলিগেট কার্ডের তালিকায় জায়গা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন নেতা। তাদের অভিযোগ, ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সোনা মানিকের দাবি, দলের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে ৫৩টি মামলা হয়েছে এবং তিনি ৯ বার কারাবরণ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদে থাকার পরও প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি ডেলিগেট কার্ড পাননি।

ডেলিগেট কার্ড বিতরণে ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার কতটা মূল্যায়ন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সোনা মানিক। তার দাবি, মোট ৭০০টি ডেলিগেট কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ক্রাইটেরিয়া থাকার কথা থাকলেও সাধারণ পদ-পদবি ছাড়া অনেক কর্মীকেও কার্ড পেতে দেখা গেছে।

সোনা মানিক বলেন, ৫৩ মামলার আসামি হয়ে ৯ বার কারাবরণ করা একজন তৃণমূল নেতা যদি দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না পান, তাহলে কারা কী বিবেচনায় ডেলিগেট কার্ড পেয়েছেন, সেটি প্রকাশ্যে আসা দরকার। থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও তিনি কার্ড না পাওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডেলিগেট কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সোনা মানিক বলেন, ৭০০ জন ডেলিগেটের তালিকা প্রকাশ করা উচিত। কারা কার্ড পেয়েছেন এবং কী যোগ্যতায় পেয়েছেন, তা জানার অধিকার তৃণমূলের নেতাকর্মীদের রয়েছে।

একই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আলী মর্তুজা। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলছি, আমি মর্তুজা, যে কিনা চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মামলার আসামি ছিলাম। যার নামে ১২৫টা মিথ্যা মামলা, আজ আমার জায়গা হলো না এই ৭০০ জনের মধ্যে। এই দায়-দায়িত্ব কে নেবে?’

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতৃত্বের প্রতিও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আলী মর্তুজা। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, যুগ্ম আহ্বায়করা এবং অঙ্গসংগঠনের যে সব নেতাকর্মীরা রয়েছেন, ধিক্কার জানাই আপনাদের। যারা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, এটার দায়-দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে এই দল ক্ষমতায় এসেছে আমাদের মতো নেতাকর্মীদের নির্যাতনের সিঁড়ি বেয়ে, আমাদের ত্যাগের কারণে এই দল ক্ষমতায়। আর আজ আমাদের মতো ছেলেদের মূল্যায়ন করতে আপনাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

আলী মর্তুজা প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই ৭০০ জন কারা?’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমি আপনাদের বলে যেতে চাই, স্বজনপ্রীতি করে এই দলকে ধ্বংস করিয়েন না।’

এদিকে ডেলিগেট কার্ড না পাওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক যুবদল নেতা এমদাদুল হক বাদশা মতবিনিময় সভা বয়কট করেছেন বলে জানা গেছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা এবং মামলা, হামলা ও কারাবরণের মতো প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলের জন্য কাজ করা নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে পছন্দের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ সভায় অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তৃণমূলে হতাশা তৈরি হবে। একই সঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সাংগঠনিক ঐক্যেও।

চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভার আগেই ডেলিগেট কার্ড বিতরণ নিয়ে এমন অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কার্ড বিতরণে অনিয়ম, পছন্দের লোকদের প্রাধান্য এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করার অভিযোগে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

আজ ৯ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলের মেজবান হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় কারা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, তা নিয়ে দিনভর নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা ও ক্ষোভ চলেছে।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ডেলিগেট কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং দলীয় ফোরামে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক নেতাকর্মী সভায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

কার্ড না পাওয়া নেতাকর্মীদের একাংশের প্রশ্ন, দলের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় তৃণমূলের প্রকৃত কর্মীদের বাদ দিয়ে যদি সুবিধাভোগী বা লোকদেখানো নেতাকর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের কাছে কী বার্তা যাবে? তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে শুধু হতাশাই বাড়বে না, সাংগঠনিক ঐক্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভায় প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে সাংগঠনিক অবদান, ত্যাগ, যোগ্যতা ও তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নেতাকর্মীদের আরও অভিযোগ, যারা দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় থেকেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে মামলা, হামলা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক আয়োজন থেকেও তাদের দূরে রাখা হলে তৃণমূলের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।

বিষয়টি নিয়ে দলীয় উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হলে তৃণমূলের মতামত ও বাস্তব অবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের মাধ্যমে সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে ডেলিগেট কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার, বাঁশখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি সফর শেষে চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

ফারুক, চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দালালির অভিযোগে বৃদ্ধের ২০ দিনের কারাদণ্ড

চট্টগ্রাম বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালির অভিযোগে মনজুর আলম (৬৫) নামে...

সড়ক নিরাপত্তায় হাটহাজারীর স্কুলছাত্রীদের সচেতনতামূলক কর্মশালা

চট্টগ্রামে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা হ্রাসে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে...

শিশু নিখোঁজ হলে সবার আগে যা করবেন

৩ সেপ্টেম্বর বিকেলের ঘটনা। আমার বাসার সহকারীর আসল নাম...

চট্টগ্রামে বিয়ে শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা, নারীসহ নিহত ২

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার...