চট্টগ্রামের রাজনীতির অন্যতমশীর্ষ নেতা, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান আর নেই। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চট্টগ্রামে উত্তর জেলা বিএনপির ডাকা সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে থাকার কথা ছিল আবদুল্লাহ আল নোমানের। চট্টগ্রামের কাজীর দেউরিতে আয়োজিত এই জনসমাবেশের জন্য পুরো এলাকা সাজানো হয়েছিল ব্যানার-ফেস্টুনে। তবে ভোরে তাঁর মৃত্যুর খবর আসার পর শোকাহত দলীয় নেতারা সমাবেশ স্থগিতের ঘোষণা দেন।
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামে জন্ম নেওয়া আবদুল্লাহ আল নোমানের রাজনীতি শুরু ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে। তাঁর বড় ভাই আবদুল্লাহ আল হারুন ছিলেন চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ষাটের দশকে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেননপন্থী ধারায় যোগ দেন। এরপর চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্রজীবন শেষে মাওলানা ভাসানীর হাত ধরে শ্রমিক রাজনীতিতে যোগ দেন। পূর্ববাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি হিসেবে শ্রমিক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালে তাঁকে ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর আবারও ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পর ১৯৮১ সালে আবদুল্লাহ আল নোমান দলটিতে যোগ দেন। চট্টগ্রামে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলার প্রায় সব জায়গায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল। চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি।
বিএনপির হয়ে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১, ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে যান। ১৯৯১ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মেয়াদে খাদ্যমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং বন ও পরিবেশমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এক-এগারোর সময় তিনি বিদেশে ছিলেন। দেশে ফেরার পর দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। শারীরিক অসুস্থতাও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত করে দেয়। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় গণসমাবেশে দেখা যায়নি তাঁকে। এটি ছিল চট্টগ্রামে বিএনপির প্রথম বড় কর্মসূচি, যেখানে নোমান অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা এতে হতাশ হন।
নেতাকর্মীরা জানান, অসুস্থ শরীর নিয়েও নোমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তবে দলে তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে অনেকের মধ্যে আক্ষেপ রয়েছে। তাঁর হাত ধরে বিএনপিতে আসা অনেকেই দলের শীর্ষ পর্যায়ে গেলেও তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে পারেননি।
মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বাদ আসর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
আবদুল্লাহ আল নোমানের ব্যক্তিগত সহকারী নুরুল আজিম হিরু জানান, আগামী শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রামের নাসিমন ভবনে বিএনপির কার্যালয়ে মরদেহ আনা হবে। সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে। এরপর বাদ জুমা জমিয়াতুল ফালাহ ঈদগাহ ময়দানে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হবে রাউজানের গহিরায়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক শোকবার্তায় বলেছেন, আবদুল্লাহ আল নোমান একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি সব ক্রান্তিকালে জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আবদুল্লাহ আল নোমান বাংলাদেশের রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নোমান ছিলেন একজন সংগ্রামী, ত্যাগী ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যু বিএনপির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, নোমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাহসী যোদ্ধা। তাঁর নেতৃত্বগুণ তাঁকে কর্মীদের হৃদয়ে অমর করে রাখবে।
বিএনপির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, নোমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কেটেছে। তিনি ছিলেন আপোষহীন রাজনৈতিক নেতা। গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর লড়াই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও বিএনপির মহানগর সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নোমানের হাত ধরেই আমরা রাজনীতি শুরু করেছি। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের বিএনপির মূল স্তম্ভ। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম।
বিএনপির মহানগর ও জেলা নেতারাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, নোমান ছিলেন সৎ, নীতিবান ও আপোষহীন রাজনীতিবিদ। চট্টগ্রামের বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
নেতাকর্মীরা বলছেন, আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যুতে বিএনপির রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর ত্যাগ, আদর্শ ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে কর্মীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
ই ডি

