চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, পাহাড় কাটার ঘটনায় আর কোনো শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা যাবে না, বরং মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “যেখানে পাহাড় কাটা হবে, সেখানে শ্রমিক নয়, পাহাড়ের মালিককে ধরবেন। কয়েকজন মালিককে গ্রেপ্তার করুন, দেখি পাহাড় কাটা বন্ধ হয় কিনা।”
তিনি এসব কথা বলেন গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের পাশে জিমনেশিয়াম মাঠে আয়োজিত অমর একুশে বইমেলার সমাপনী ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রদত্ত ‘একুশে স্মারক সম্মাননা পদক ও সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম, চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি মো. সাহাবুদ্দীন হাসান বাবু। স্বাগত বক্তব্য দেন বইমেলা কমিটির আহ্বায়ক ও চসিকের প্রধান নির্বাহী শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, চট্টগ্রামের সৌন্দর্য পাহাড়, সমুদ্র ও প্রাকৃতিক সম্পদে। যদি এগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে চট্টগ্রাম আর চট্টগ্রাম থাকবে না। পাহাড় রক্ষার দায়িত্ব সবার। তিনি জানান, জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে শহরকে ছয়টি জোনে ভাগ করেছেন এবং প্রতিটি জোনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
তিনি বলেন, “এবার থেকে ডিসির দায়িত্ব হলো পাহাড়ের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা, মালিককে সত্যিকার অর্থে গ্রেপ্তার করা এবং আইনের মুখোমুখি করা। আমি দেখব মালিক গ্রেপ্তার হলে পাহাড় আর কাটা হয় কিনা।”
উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ কখনো জিততে পারেনি। একটা গাছ কেটে ফেললে নতুন গাছ লাগানো যায়, কিন্তু একবার পাহাড় কেটে ফেললে সেটা আর ফিরে আসে না।
শব্দদূষণ রোধে গাড়িতে অহেতুক হর্ন না বাজানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “কিছু কিছু পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের, যেমন শিল্প দূষণ। আবার কিছু দায়িত্ব জনগণেরও আছে। আপনি গাড়িতে হর্ন বাজাবেন, বাজারে গেলে ১০টা পলিথিন ব্যাগ কিনবেন, আর বলবেন সরকার পলিথিন নিষিদ্ধ করতে পারছে না—এটা হবে না। সরকার যদি ব্যর্থও হয়, আপনি কি সফল হবেন?”
বইমেলায় তরুণদের সরব উপস্থিতি দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, তরুণরাই জাতির আশার আলো। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা একটা দর্শন নিয়ে জীবন গড়েছি, দেশটাকে দেখেছি। সেই দর্শন আর সেই পদ্ধতির ফল হচ্ছে আজকের সবচেয়ে দূষিত নগরী। তোমরা এমন একটা ভবিষ্যৎ গড়বে, যা এই তকমা থেকে আমাদের মুক্তি দেবে।”
চট্টগ্রাম বইমেলার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, “এই বইমেলায় যে আদর্শ, মূল্যবোধ এবং চিন্তার বিনিময় হয়েছে, তা আমাদের সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব, বাসযোগ্য ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়তে সাহায্য করবে।”
চট্টগ্রামের বইমেলায় পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা বইমেলায় আমরা কোনো স্টলে পলিথিন ব্যবহার করতে দিইনি। চট্টগ্রামে এবার যদি তা না করা সম্ভব না হয়, তাহলে আগামী বছর থেকে পলিথিন নিষিদ্ধ করুন।”
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি জানান, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও পরিবেশবিরোধী কাজ হচ্ছে, এবং এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন সর্বদা তৎপর।
এবার একুশে স্মারক সম্মাননা পদক পেয়েছেন সমাজসেবায় লায়ন কামরুন মালেক, ভাষা আন্দোলনে বদিউল আলম চৌধুরী (মরণোত্তর), সমাজসেবা ও গবেষণায় প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যাপক ডা. ইমরান বিন ইউনুস, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, সঙ্গীতে নকিব খান, সাংবাদিকতায় জাহেদুল করিম কচি এবং ক্রীড়ায় তামিম ইকবাল খান।
সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কথাসাহিত্যে প্রফেসর আসহাব উদ্দীন (মরণোত্তর), প্রবন্ধ ও গবেষণায় প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান, শিশুসাহিত্যে মিজানুর রহমান শামীম, শিশু-চিকিৎসা সাহিত্যে প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী, কবিতায় জিললুর রহমান এবং অনুবাদে ফারজানা রহমান শিমু।
সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও অন্যান্য অতিথিরা।
বইমেলা শুরু হয়েছিল ১ ফেব্রুয়ারি, যা ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পাঠকদের আগ্রহের কারণে মেলার সময় দুই দিন বাড়ানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার মেলায় বই কেনাবেচা চলবে, তবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা থাকবে না।
বইমেলা কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, এবারের বইমেলায় ২.৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে এবং ২০০টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। ঢাকার পর চট্টগ্রামের বইমেলাই দেশের সবচেয়ে বড় বইমেলা। তিনি বলেন, “ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও বইমেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।”
ই ডি

