চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া রাজাখালী এলাকার বাসিন্দা শহীদুল আলম। টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় খবর পেয়েছেন, চট্টগ্রামে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেঁধে দিয়েছে প্রশাসন। সেই আশায় নগরের কয়েকটি গলি ঘুরেও কম দামে খোলা সয়াবিন তেল কিনতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত গেছেন দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। সেখানেও মিলেনি কাঙ্ক্ষিত মূল্য। ঘুরেছেন চাক্তাইও। সব জায়গায় ঘুরে হতাশ বেড়েছে তার। আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, ‘গতকাল টিভিতে দেখলাম, চট্টগ্রামে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কমেছে। একইসঙ্গে দামও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মনে করেছি গতকাল বিকেলে না পেলেও আজ সকাল থেকে পাব। তবে গলির দোকানের পাশাপাশি চাক্তাইয়ে এসেও কম দামে তেল নিতে পারিনি।’
শুধু শহীদুল আলমই নন; তার মতো অনেকেই ১৬০ টাকা দামে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির খবর শুনে বাজারে গিয়েছেন। তারা কেউই সেই দামে তেল না পাওয়া অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আফতাব হোসেন রহমান নামে একজন বলেন, ‘দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে প্রভাব নেই। আর এটা আদৌ সম্ভব হবে কিনা জানা নেই। তবে দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসন থেকে বাজার মনিটরিং করাটা জরুরি। আর সেটা এক বা দু’দিন নয়। টানা অভিযান চালাতে হবে।’
খাতুনগঞ্জের মেসার্স মক্কা স্টোরের স্বত্তাধিকারী তৌফিকুল আলম জানান, ‘খুচরা পর্যায়ে আমরা খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ১৮৭ থেকে ১৯০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি করছি। আর পাইকারিতে ১৮২ থেকে ১৮৩ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হচ্ছে।’
নতুন দাম নির্ধারণের বিষয়টি জানিয়ে এখনো আগের দাম বিক্রি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকল পর্যায়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা যেই রেটে তেল এনেছিলাম সেই রেট দিয়ে তো নতুন দামে বিক্রি করা সম্ভব না। আগের তেল শেষ হওয়ার পর নতুন আনা তেল যদি কম দামে নিতে পারি, তাহলে আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারবো।’
এই পরিস্থিতি শুধু পাইকারি বাজারেই নয়, খুচরাতেও প্রশাসন যে দাম নির্ধারণ করেছে, তার থেকে ৩০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন।
বুধবার নগরের বহদ্দারহাট বাজারে আসা ক্রেতা ইরফান কাদেরী জানান, গতকাল মঙ্গলবার ফেসবুকে ও আজ বুধবার সকালে পত্রিকাতেও দেখলাম, খোলা সয়াবিন ১৬০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না। অথচ বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন ১৯২ টাকা চাইছে। তারা তো প্রশাসনকেও মানছে না। প্রশাসন যে দাম নির্ধারণ করেছে, তার থেকে ৩০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে খোলা সয়াবিন।’
জানা যায়, দেশের বাজারে সয়াবিনের বাজারে সংকট গত নভেম্বর মাস থেকে। বাজারে খোলা সয়াবিনের দাম বাড়তি আবার বোতলজাত সয়াবিন প্রায় নেই–ই বলা চলে। গত ৯ ডিসেম্বর সরকার খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৫৭ ও বোতলজাত সয়াবিনের দাম প্রতি লিটার ১৭৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তবে এ দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে না সয়াবিন তেল। এর মধ্যে মঙ্গলবার আমদানিকারক, মিলমালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে খোলা সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করে দেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন ও জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এতে আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত খোলা সয়াবিন পাইকারি পর্যায়ে ১৫৫ এবং খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে এ দর কার্যকর হয়নি বাজারে।
নগরের বহদ্দারহাট ও চকবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা দোকানগুলোতে খোলা সয়াবিনের দাম প্রতি লিটার ১৯০ থেকে ১৯৩ টাকা চাওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকে তাঁরা আগে বেশি দরে কিনেছেন। সেই তেল শেষ হলে এরপর নতুন তেল কিনবেন। পাইকারি বাজার থেকে কম দামে কিনতে পারলে কম দামে বিক্রিতে তাঁদের আপত্তি নেই।
বুধবার দুপুরে নগরের কাজীর দেউড়ি বাজার পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার পর্যন্ত আমরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে দেখতে পেয়েছিলাম, বোতলজাত সয়াবিন গায়েব ছিল। কোথায় যেন উধাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ (বুধবার) থেকে দোকানে আমরা বোতলজাত সয়াবিন তেল দেখতে পাচ্ছি। আমি আশাবাদী, কাল থেকে আরও বেশি সয়াবিন তেলের বোতল পাওয়া যাবে। আমাদের একটি টিম খাতুনগঞ্জে গেছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা ১৫৫ টাকায় খুচরা বিক্রেতাদের তেল বিক্রি করছে কি না, সেটা মনিটরিং করছে। নির্ধারিত এ তেলের দাম যতক্ষণ পুরো চট্টগ্রামে ১০০ শতাংশ কার্যকর না হবে ততদিন আমাদের অভিযান চলবে। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিদিন বাজার মনিটরিং করবে। যারা নির্দেশনা মানবে না তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। যদি কেউ নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রি করেন বা মজুতদারি করেন, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিছু ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, তাঁরা বেশি দামে তেল কিনেছেন, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে চান। কিন্তু আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না।’
সিটি মেয়র আরও বলেন, খোলা ভোজ্যতেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেউ এই দামের চেয়ে বেশি নিলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি বাজারে মনিটরিং টিম কাজ করছে।
পরবর্তীতে চসিকের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যার নেতৃত্বে নগরীর ব্যাটারি গলি বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় বিভিন্ন মুদি দোকান, তেলের দোকান, দৈনন্দিন কাঁচা বাজারের দোকানে মূল্য তালিকা না থাকার অভিযোগে ১২ দোকানদারের বিরুদ্ধে মামলা রুজু পূর্বক ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
বহদ্দারহাটে অভিযান পরিচালনা করেন চসিকের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরীন ফেরদৌসী। অভিযানে ধার্যকৃত মূল্য সয়াবিন তেল বিক্রির জন্য ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
খাতুনগঞ্জে চসিকের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের সময় অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য বিক্রির অপরাধে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা রুজু পূর্বক ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এদিকে এখনো অনেক জায়গায় ব্যবসায়ীরা খোলা সয়াবিন তেলের নতুন দামের বিষয়ে জানেন না। তাই তারা এখনো আগের দামেই সয়াবিন তেল বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
তিনি জানান, ‘মাত্রই তো নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আজকেও বাজার মনিটরিংয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় এখনো বেশি দামেই বিক্রি করা হচ্ছে। আগামীকাল পর্যন্ত দেখবো। শুক্রবার থেকে নতুন দামে তেল বিক্রি না করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে চট্টগ্রামের চকবাজার, বড়পুল বাজার, পাহাড়তলী বাজার, পুরাতন পোর্ট বাজারে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় বিভিন্ন মুদি দোকান, তেলের দোকান, কাঁচা বাজার, ফলের দোকান এবং মাংসের দোকানে মূল্য তালিকা না থাকা, পণ্যের অতিরিক্ত মূল্যগ্রহণ ও মোড়কজাতকরণের যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করা এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী বিক্রয়ের অভিযোগে জরিমানা করেন। এসময় চকবাজারে ৫ দোকানকে ১৪ হাজার পাঁচশত টাকা, বড়পুল বাজারের ৪টি দোকানকে ৯ হাজার টাকা, পাহাড়তলী বাজারের ২ দোকানকে ৪ চার হাজার এবং পুরাতন পোর্ট বাজারের ২ দোকানকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চৌধুরী/চট্টলা২৪

