আমজাদ রশিদ, ফেনী
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর কোনঠাসা হয়ে পড়েছে দলটির নেতাকর্মীরা। নির্যাতন, অত্যাচার, হামলা ও মামলার কারণে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছেন দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী। সারাদেশের মধ্যে অত্যাচারের মাত্রা বেশি চালানো হয়েছে ফেনী জেলায়। সোনাগাজী উপজেলার চরদরবেশ ইউনিয়নের কৃষক লীগ নেতা ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখলে নিয়েছে বিএনপি-জামায়াত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। মিলেছে প্রাণনাশের হুমকিও। এই কারণে সরকার পতনের পর থেকেই এলাকাছাড়া এই নেতা।
সোনাগাজী থানা সূত্রে জানা গেছে, ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) বিরুদ্ধে ফেনী জেলার বিভিন্ন থানায় অন্তত দশটি মামলা রুজু হয়েছে। যার বেশিরভাগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন ছাত্রদের উপর হামলা ও বিস্ফোরক আইনের মামলা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরদরবেশ ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) মালিকানাধীন সৈকত এগ্রোতে বিনিয়োগ করা হয় পাঁচ কোটি টাকা। কর্মসংস্থান হয় শতাধিক লোকের। পশুখাদ্য, ঔষধ ও গবাদিপশু পালন করে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রতিমাসে আয় হতো ন্যূনতম লাখ টাকা। তবে সরকার পতনের পর প্রথমে আগুন দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিতে। এরপর লুটপাট করা হয় খামারের ৩০টি গরু। হামলা চালিয়ে আহত করা হয় এগ্রোর ম্যানেজার কেফায়াত উল্লাহ, এগ্রোর সহকারী মোহাম্মদ রমজান, সোহাগ বিশ্বাস, নিপুন দে, আফজাল খান, ফরহাদ মিয়া, অনন রহিমসহ আরো অন্তত ১০ জনকে। এদের মধ্যে রমজান, নিপুন দে ও অনন রহিমের অবস্থা গুরুতর। তারা ভর্তি ফেনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাথা, কোমড় ও পায়ে গুরুতর আঘাত নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা নড়ছেন তারা।
ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) বাবা সাহাব উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিল। রাজনীতিতে তার দীর্ঘ বছরের ক্যারিয়ার। কখনো কাউকে অত্যাচার-নিপীড়ন করেনি। মানুষের সঙ্গে সব সময় সে ভালো আচরণ করেছিল। অথচ পাঁচ আগস্টের পর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করতে বিএনপি জামাত ও সমন্বয়করা অযাচিতভাবে তার প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। সৈকত খামারে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে একাধিক মিথ্যা মামলা রুজু হয়েছে। আমরা পুরো পরিবার এখন আতঙ্কে ভুগছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) মা অভিযোগ করেন, তার ছেলে জীবনেও মানুষের ক্ষতি করেনি। সৈকতের মাধ্যমে এলাকায় শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অথচ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সে বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছে। সন্ত্রাসীরা রাত দিন অস্ত্রসহ আমাদের বাড়িতে টহল দিচ্ছে। প্রশাসনের কাছে বারবার বলার পরেও তারা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উল্টো সৈকতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রুজু করেছে।
ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) বড় ভাই ফখরুল ইসলাম শামীম বলেন, আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে একাধিক মিথ্যা মামলা রুজু হয়েছে। সে কোন অপরাধের সঙ্গে জড়িত না। বাস্তব প্রেক্ষাপট হচ্ছে, ক্ষমতারচ্যুত আওয়ামী লীগের নাম শুনলেই এখন ফেনীতে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সৈকত এগ্রোর সহকারী মোহাম্মদ রমজানের স্ত্রী উম্মে হাবিবা বলেন, আমার স্বামীর কোন দোষ নেই। সে সৈকত এগ্রোতে সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিল। কিন্তু সন্ত্রাসীরা সৈকতকে না পেয়ে আমার স্বামীকে নির্মমভাবে মারধর করে। গত এক মাস ধরে হাসপাতালে আমার স্বামী মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।
সৈকত এগ্রোর সহকারী নিপুন দের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে পান্না রানী দে বলেন, আমার বাবাই আমাদের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল। বাবা ছোটখাটো একটা চাকরি করায় আমাদের জমানো কোন টাকা নাই। গত একমাস যাবত হাসপাতালে আমার বাবা চিকিৎসাধীন। আর্থিক টানাপোড়নে পরিবারের দশা ছিত্তিসান হয়ে গেছে। আমরা নিরুপায় হয়ে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বাবার চিকিৎসার করাচ্ছি। এ পর্যন্ত ২ লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে। তারপরও বাবার মাথায় দেওয়া কোপের আঘাত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।
এ বিষয়ে জানতে ফাইজুল ইসলামের (সৈকত) মুঠো ফোনে বেশ কয়েকবার কল দিয়েও সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। এই কারণে তার বক্তব্য জানা যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এক আত্মীয় বলেছেন, চতুরর্দিক থেকে আসা হুমকির মুখে জীবন বাঁচাতে এসে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।
সৈকত এগ্রো দখল করা বিএনপি নেতা আব্বাস করিম ও জব্বরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন বলেন, সৈকতের এগ্রোতে উত্তেজিত জনতা হামলা চালিয়েছে। তবে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সিগনাল না থাকায় মামলা নেওয়া হয়নি। সৈকতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। পুলিশ তাকে খুঁজছে। এলাকার ছেড়ে চলে যাওয়ায় তার সন্তান মিলছে না। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
রহমান, চট্টলা২৪

