বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার
কক্সবাজারের অন্যতম সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজ বর্তমানে একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যক্ষ নিয়োগ ইস্যুতে চরম অস্থিরতা ও ক্ষোভের মুখে পড়েছে। এই নিয়োগ ঘিরে উঠে এসেছে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক, দুর্নীতি, এবং বিধি লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিতর্কিত সাবেক অধ্যক্ষ এ কে এম ফজলুল হক, যিনি অতীতে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে জনচাপের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন।

কে এই ফজলুল হক?
এ কে এম ফজলুল হক পূর্বে লোহাগড়ার আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তার সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অভিভাবক, শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং ছাত্ররাজনীতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপের একাধিক অভিযোগ উঠে আসে।

বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ফজলুল হকের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় কোটি টাকার দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীরা সংবাদ সম্মেলন করে তার পদত্যাগের দাবি জানালে, তিনি ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট অবশেষে পদত্যাগে বাধ্য হন।

লক্ষ্যবস্তু ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজ:
পদত্যাগের এক বছর পার না হতেই, ফজলুল হক এবার ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। পূর্বের কলজে তার বিরুদ্ধে কোন আর্থিক দূর্নীতি নাই বলে হলফনামা প্রদান করেন। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে আর্থিক তচরুফের প্রমাণ পেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রথম থেকেই শিক্ষক সমাজ ও সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দেয়। কারণ, নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত অংশে দ্বিতীয় হয়েও ভাইভায় প্রথম স্থান পাওয়ায় শুরু হয় বিতর্কের ঝড়।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, কলেজের দাতা সদস্য এবং সাবেক বিএনপি এমপি ইঞ্জিনিয়ার শহীদুজ্জামান, যিনি একইসঙ্গে শহিদুজজামানের ভাগিনির জামাই। তিনি কলেজের নিয়োগ বোর্ডে বিধিমোতাবেক উপস্থিত থাকার যোগ্য নন, তবুও তিনি মৌখিক পরীক্ষার দিন হঠাৎ উপস্থিত হয়ে নিয়োগ বোর্ডকে প্রভাবিত করেন।

এছাড়া, কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আজিজুর রহমানের সাথেও ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ। অনেকেই একে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে দেখছেন, যার উদ্দেশ্য হলো দলীয় দোসরকে প্রতিষ্ঠানে বসানো।

নিয়োগ পরীক্ষা ও ফলাফল:
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় ৬ জন প্রার্থী অংশ নেন, যার মধ্যে ৩ জন পাস করেন। ফজলুল হক লিখিত পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও, “অপ্রত্যাশিতভাবে” ভাইভায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। এর ফলে তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে সুপারিশ করে নিয়োগ কমিটি।

নিয়োগ কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়োগ কমিটির সদস্যরা ছিলেন:
১. অধ্যাপক আজিজুর রহমান– সভাপতি, কলেজ গভর্নিং বডি ও নিয়োগ পরীক্ষার সভাপতি
২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির প্রতিনিধি– সদস্য ও বিষয় বিশেষজ্ঞ
৩. মোহাম্মদ আমির আনোয়ার চৌধুরী–ডিজি প্রতিনিধি ও অধ্যক্ষ, কক্সবাজার সরকারি কলেজ।
৪. মো. ইরফানুল হক– নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কক্সবাজার ও জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি
৫. জসিম উদ্দিন– সদস্য সচিব ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ

নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন:
যেখানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দাতা সদস্যের মৌখিক পরীক্ষায় থাকার সুযোগ নেই, সেখানে সাবেক এমপি শহীদুজ্জামানের উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবৈধ করে তুলেছে বলেই অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, ফজলুল হক আবেদনপত্রে তার আগের কলেজ থেকে ছাড়পত্র না পেয়েও তথ্য গোপন করে আবেদন করেন, যা একপ্রকার প্রতারণার শামিল।

ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া :
এই ঘটনায় প্রতিবাদে সরব হয়েছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর কক্সবাজার জেলা শাখা এক বিবৃতিতে জানায়,
“ফজলুল হক শিক্ষকতার চেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন দলীয় রাজনীতিতে। এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে কক্সবাজারের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখতে চাই না।”

শিক্ষক মহলও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছে, প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না থাকলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও শিক্ষার্থীদের মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বর্তমান অবস্থা :
২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট কলেজ গভর্নিং বডি নিয়োগ কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পূর্বানুমতির জন্য ফাইল প্রেরণ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যেখানে মেধা, সততা ও নেতৃত্ব গুণের ভিত্তিতে একজনকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা, সেখানে রাজনৈতিক, আত্মীয়তার পরিচয় ও প্রভাব যদি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি গোটা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আজিজুর রহমান বলেন, আমরা ইন্টারভিউটিতে লিখিত পরীক্ষা নিয়েছি, আইনি বিধান মেনে আমরা যেসব ধাপ অতিক্রম করেছি সেখানে সে এগিয়ে আছে। আমি না থাকায় এখনো নিয়োগপত্র দেইনি, তবে খুব শীঘ্রই নিয়োগপত্র ইস্যু করব। ইতিপূর্বে তিনি যদি কোন অপরাধের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন। বিষয়টি আমরা জানি না, আমাদের নলেজে নেই।

ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজের অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, আমরা পত্রিকার মাধ্যমে যে নিয়োগ দিতে চাচ্ছি, সেখানে তার আর্থিক ও নারীগঠিত কোনো কেলেঙ্কারি নেই- এই মর্মে উনি নিজেকেই একটা ডিক্লারেশন দিতে হয়। এটার ডিক্লোরেশন আছে। যদি এই ধরনের কোন বিষয়ে আসে তাহলে আমরা খবর নিব। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এর গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়া গেলেও সেখানে যে শর্ত রয়েছে, সর্বশেষ চাকুরী যত প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র যদি না হয় তাহলে উনাকে নিয়োগ দেওয়ারও সুযোগ নেই, উনি এখানে যোগ দেওয়ারও সুযোগ নেই। তার পূর্বের প্রতিষ্ঠানে যদি এই ধরনের কোনো অপরাধ থাকে তাহলে তাকে ছাড়পত্র কেউ দিবে না।

তবে এই বিষয়ে জানতে ঈদগাহ রশিদ আহমদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ কে এম ফজলুল হকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। এই কারণে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

চৌধুরী, চট্টলা২৪

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন চমেক হাসপাতাল, বন্ধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ...

পর্নোগ্রাফি তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল, ৩৩ হাজার টাকা আদায়; আশুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার ১

চট্টগ্রামের ডবলমুরিংয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অশ্লীল ছবি ও পর্নোগ্রাফি ভিডিও...

বড় সাজ্জাদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ডিবির হাতে বিএনপি নেতা হাশেম রাজুর জামাতা

চট্টগ্রামের আলোচিত আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী...

৯ শ্রমিকের মৃত্যুর দুদিন পর সীতাকুণ্ডের আরেক শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার দুদিনের...