হরমুজ প্রণালী ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আবারও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। সোমবার(১৩ জুলাই) ভোরে পাঁচটায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত অপরিশোধিত তেল (ব্রেন্ট ক্রুড) এর দাম ৪ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
যা সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত ব্রেন্ট ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৯.২৬ ডলারে পৌঁছেছে। গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর ফলে নৌ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।
সামুদ্রিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টার মধ্যে মাত্র ছয়টি জাহাজকে এই প্রণালী অতিক্রম করতে দেখা গেছে। অথচ চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২২টি জাহাজ এই সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচল করতো।
উইন্ডওয়ার্ডের তথ্যমতে, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রবিবার সকাল ৬টার মধ্যে এই জলপথে নয়টি জাহাজ চলাচল করেছে, যার মধ্যে চারটিতে ইরানের পতাকা ছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করত, যা বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশের প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে শত শত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা পরই দেশটির ওপর আরও কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কন্টেইনারবাহী জাহাজ ‘এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি’ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পার হওয়ার সময় ইরান হামলা চালিয়ে এমন অভিযোগের পর দেশটিতে দফায় দফায় হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। রবিবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ববাণিজ্যের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। ইরান এর নিয়ন্ত্রণকারী নয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের অব্যাহত অযৌক্তিক আগ্রাসন, হয়রানি, হুমকি এবং খেয়ালখুশিমতো ঘোষণার পরেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মার্কিন হামলার জবাবে তেহরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের ওপর একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবিদার ইরানের ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ আগেই পুনর্ব্যক্ত করেছিল, যেসব জাহাজ তাদের নির্দেশিত বা পছন্দের পথ ব্যবহার না করে এই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করবে তাদের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা প্রযোজ্য হবে না।
সংস্থাটি জানিয়েছে, অনুমোদিত নয় এমন পথ দিয়ে চলাচলের ফলে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির দায়ভার সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক, অপারেটর এবং অধিনায়কের ওপরই বর্তাবে।
গত ১৭ জুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তেলের দাম সংঘাত-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এসেছিল। কিন্তু বর্তমানে তা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলার আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এক্স-অ্যানালিস্টস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তেল বিশ্লেষক মুকেশ সহদেব বলেছেন, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে অপরিশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) ব্যারেল প্রতি দাম ৭০ ডলারের ওপরের দিকেই (৭০-এর দশকের শেষভাগে) অবস্থান করবে বলে তিনি ধারণা করছেন।
শনিবার গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক বার্তায় সহদেব বলেন, এই সীমার বাইরে দামের মাঝে মাঝে হঠাৎ বৃদ্ধি বা পতন ঘটতে পারে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রহের প্রক্রিয়ার কারণে তেল শোধনাগারগুলোকে সরবরাহের বিষয়ে কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই সিদ্ধান্তগুলোর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তাৎক্ষণিক নির্ভরতা অনেকটা কমে এসছে। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সেই প্রবণতাকে উল্টে দেওয়ার পরিবর্তে আরও জোরদার করবে বলেই মনে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত ‘আইজি’-এর বাজার বিশ্লেষক ফাবিয়ান ইপ বলেছেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও তেলের দাম যুদ্ধের শুরুর দিকের সেই উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। সোমবার গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো এক বার্তায় ইপ বলেন, জুন মাসে তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসার বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছিল, বাজারগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর সমঝোতা নিয়ে সবচেয়ে ভালো ফলাফলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছিল; কিন্তু গত সপ্তাহে উত্তেজনা নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে সেই ধারণাটি কতটা ভঙ্গুর ছিল।
স্বল্পমেয়াদে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’-এর প্রভাবে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দামের বড় ধরনের আকস্মিক উত্থান বা ‘স্পাইক’ পুনরায় ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ চাহিদার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে এবং এর পাশাপাশি আটকে পড়া ট্যাঙ্কার থেকে তেল ছাড়া ও ওপেক প্লাস কর্তৃক উৎপাদন কোটা বৃদ্ধির ফলে বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহের পরিস্থিতি আরও বাড়ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর জেরে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দরপতন হয়েছে। দুপুরের লেনদেনে জাপানের প্রধান সূচক ‘নিক্কেই ২২৫’ ২ শতাংশেরও বেশি কমেছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কস্পি’ সূচক ৮ শতাংশেরও বেশি কমে এসেছে।
সাব্বির, চট্টলা২৪

