বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউপির সমুদ্র লাগোয়া প্যারাবনের হাজার হাজার কেওড়া ও বাইন গাছের চারা সাবাড় করে জোরপূর্বক বন বিভাগের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ করেছেন বন বিভাগের বাঁশখালী উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল। এই ঘটনায় পশ্চিম সরল ১নং ওয়ার্ডের গিয়াস উদ্দিন ও আলী হোসেনসহ ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করে বাঁশখালী থানায় এজহার দায়ের করেছেন বাঁশখালী উপকূলীয় রত্নপুর বিট কর্মকর্তা মো. শাহজাহান মিয়াজি। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বন বিভাগের পক্ষে আরও একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানায় বাঁশখালী উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল।
এজহার সুত্রে জানা যায়, ‘গত (৪ নভেম্বর) সোমবার সকালে বন বিভাগের একটি টহল দল সরল এলাকার স্থানীয় দুষ্কৃতকারীকে একটি দল ম্যানগ্রোভের কেওড়া ও বাইন গাছের চারা সাবাড় করতে দেখতে পায়। পরে ম্যানগ্রোভ বনের গাছ কাটতে বাধা দিলে জায়গাটি তাদের পূর্বপুরুষের বলে দাবি করেন তাঁরা। এবং বন বিভাগের কর্মীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেন। একই সাথে দ্রুত স্থান ত্যাগ না করলে প্রাননাশের হুমকি প্রদান করেন। এ সময় তাঁরা দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র সজ্জিত থাকায় বন বিভাগের কর্মীরা তাদের কাউকে আটক না করে পালিয়ে আসেন। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রায় ২০ হাজার কেওড়া ও বাইন গাছের সাবাড় করা চারা উদ্ধার করা হয়। একই সাথে ৫টি দা ও ১০টি কাস্তেও জব্দ করে বন বিভাগ। এতে বনের এগারো লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে ঐ ঘটনায় চিহ্নিত ৩৪ জনকে আসামি করে এজহার দায়ের করা হয়।’
বন বিভাগ সুত্রে জানা যায়, ‘বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া ও সরল মৌজায় ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ম্যানগ্রোভ বনের জন্য উপকূলীয় চরে ৬০ হেক্টর জায়গায় আড়াই লক্ষ চারা রোপণ করা হয়। এসবের মধ্যে কেওড়া ও বাইন গাছের চারা অন্যতম। বর্তমানে ঐ সব জায়গায় চারা গাছগুলো দৃশ্যমান। তবে ৫ আগস্টের পরে দেশে বিশৃঙ্খলার সুযোগে বন বিভাগের জায়গা দখল করে লবণের ঘের ও মাছঘের করার জন্য বন বিভাগের রোপণ করা কয়েক হাজার চারা গাছ সাবাড় করে স্থানীয় একটি চক্র। পরে একই চক্র বাগানের চারদিকে দৃশ্যমান বাঁধ দিয়ে ম্যানগ্রোভের কয়েক হেক্টর জায়গা দখল নেওয়ার চেষ্টা করে। যা এখনো চলমান রয়েছে। প্রতিদিন গভীর রাতে ঐ জায়গায় স্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টার করে চক্রটি। একই সাথে প্রতিদিন রাতে হাজার হাজার চারা গাছ কেটে ফেলে। যা বাংলাদেশ দন্ডবিধি-১৮৬০ এর ১৮৬ ধারা মোতাবেক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
নাম না প্রকাশে এক স্থানীয় জানান, ‘সরল এলাকার আ.লীগ নেতা কবির আহমেদ ওরফে লম্বা কবিরের নেতৃত্বে বনের জায়গা দখলে উঠেপড়ে লেগেছে স্থানীয় একটি ভূমিদস্যু চক্র। তাঁরা এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে তাঁরা বন বিভাগের কর্মকর্তাসহ স্থানীয়দের প্রাণনাশের হুমকি ধামকি দিচ্ছে। তাঁরা যে কোন মূল্যে ম্যানগ্রোভের জায়গাটি দখলে নিতে চাই। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে তাঁরা পুরো সরল এলাকার ম্যানগ্রোভ বন চিরতরে ধ্বংস করে ফেলবে।’
এদিকে এই ঘটনায় বনের জমি রক্ষা ও চারা গাছ সাবাড়ে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনী বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানান উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল। তিনি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে সরল এলাকার স্থানীয় একটি ভূমিদস্যু চক্র দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র সজ্জিত হয়ে ম্যানগ্রোভের হাজার হাজার কেওড়া ও বাইন গাছের চারা সাবাড় করেছেন। লবণ ঘের ও মাছঘের করার জন্য বন বিভাগের কয়েক হেক্টর জায়গা দখল নিতে তাঁরা মরিয়া হয়ে উঠে। এ লক্ষ্যে তাঁরা ম্যানগ্রোভের চারা গাছ সাবাড় করে চারদিকে বাঁধ দিতে থাকে। বাঁধা দিলে বন বিভাগের টহল দলকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এতে পুলিশ ও বন বিভাগের পক্ষে থেকে কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তাঁরা গভীর রাতে এসব করে। এ ঘটনায় জড়িত ৩৪ জনের নামে উল্লেখ করে বাঁশখালী থানায় এজহার দায়ের করা হয়েছে। মামলা দিলেও তাঁরা দ্রুত জামিন নিয়ে আবারও একই ঘটনা ঘটায়। এ বিষয়ে ইউএনও স্যার ও সেনাবাহিনীকেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রাণ ভয়ে রয়েছেন বন বিভাগের কর্মীরা। এ ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বন বিভাগের ব্যাপক ক্ষতি হবে। ধ্বংস ও দখল হয়ে যাবে ম্যানগ্রোভের ৫০ হেক্টর জায়গা।
বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পুলিশ প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকা ও চর এলাকা হওয়ার কারণে আসামিদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। তারপরও আমরা জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘অভিযোগ আসার পরপরই বন বিভাগ ও পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ঐ এলাকার বন কর্মকর্তাকে সেনাবাহিনীকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছি। আমি নিজেও এবিষয়ে তাঁদের সাথে কথা বলেছি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

