ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা বানীটি একটি সাধারণ স্বাভাবিক বানী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং ধারাবাহিক একটি চক্রান্তের পরিকল্পিত অংশ মনে করছি। সংক্ষেপে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছি :
ভারত ১৯৫০ থেকে ৭১ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে হায়দ্রাবাদ কৌশলে প্রথম পর্বে খেলেছে। আর ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নিয়ে সেই হায়দ্রাবাদ কৌশলের দ্বিতীয় পর্বের খেলায় মেতেছে। ১৯৭২ থেকেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি রাজনীতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
একটু পেছনের ইতিহাস ঘাটলে দেখবেন, পাকিস্তান আর ভারতের স্বাধীনতার সাথেই কিন্তু হায়দ্রাবাদ একটি স্বাধীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র ছিলো। হায়দ্রাবাদ দখলের জন্য ভারত তিনটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। ১. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ২. অপপ্রচার ৩. নিজেদের পক্ষে দালাল তৈরি। মাত্র দুই বছরের মাথায় ইন্ডিয়া সফলভাবে বিশাল হায়দ্রাবাদ দখল করে। তেলেঙ্গানা অন্ধ্রপ্রদেশ মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যের সাথে টুকরো টুকরো করে যুক্ত করে দেয়। বর্তমানে বিশাল হায়দ্রাবাদের অত্যন্ত খুদ্র একটি অংশ ‘হায়দ্রাবাদ নাম নিয়ে ভারতের একটা শহর মাত্র’। বাংলাদেশ নিয়ে ভারত একই পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
১৯৭১ সালে ভারত কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যুদ্ধ করেছে? আসেন একটু চিন্তা করি- যদি পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্তি না আসতো তাহলে ভারত নিজেই এতোদিনে বহুভাগে বিভক্ত হয়ে ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ নাগা বিহার কাশ্মীরসহ বহু স্বাধীন দেশের মানচিত্রে বিভক্ত হয়ে – খণ্ড খণ্ড যেতো।
আসলে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য লড়েনি- তারা মূলত পূর্ব পাকিস্তানের ঘাড়ে বন্দুক রেখে পশ্চিম পাকিস্তানকে ৫০% দুর্বল করেছে। ২০২৩/২৪ সালের এই সময়ে পশ্চিমারা যেমন ইউক্রেনের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদেরকে রাশিয়ার হুমকি থেকে রক্ষার কৌশল নিয়েছে- ৭১ সালে ভারতও সেই কৌশলে লড়েছে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।
ইতিহাস বলছে; ভারত বাংলাদেশের পক্ষে বিনে পয়সায় লড়েনি; ভারতের সেই সমর্থনের মূল্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার চুকাতে হয়েছে এই বাংলাদেশকে। শুধু কি তাই? ভারতের সৈনিকেরা এদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় মানুষের গরুছাগল থেকে শুরু করে বাঁশ গাছ পর্যন্ত চুরি করে নিয়ে গেছে। ভারত সব সময় চেয়েছে বাংলাদেশকে দখল করতে না পারলেও তাদের একটি কলোনি হিসেবে ব্যবহার করতে।
সিকিমের ইতিহাস জানেন? ৭৪ সালে অত্যন্ত নিখুঁত কূটকৌশলে এবং কোন রক্তপাত ছাড়াই; শুধুমাত্র সিকিমের নেতাদের কিনে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম সিকিম দখল করে নেয় ভারত সরকার।
ভারতের চারপাশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কোনটির সাথে তাদের সুসম্পর্ক নেই। ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মায়ানমার, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, শ্রীলঙ্কা- সবার সাথে তারা অত্যন্ত নোংরা-নিকৃষ্ট আগ্রাসী আচরণের কারণে বিতাড়িত। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা প্রবাহ দেখেন, মালদ্বীপের মতো ছোট্ট একটা দেশ বাধ্য হয়ে অনেকটা লাত্থি মেরেছে ভারতের গালে! অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে; উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশই ভারতের তাবেদারীকে নির্লজ্জ কাপুরুষের মতো লেহন করে গেছে এতটা সময়। আমাদের দূর্ভাগ্য; স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় প্রত্যেকটি সরকার নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লোভে ভারতের প্রেসক্রিপশন লেহন করে গেছে হায়দ্রাবাদের রাজনীতিবিদদের মতোই। রাজনীতিবিদদের এই নৈতিক দূর্বলতা এবং ক্ষমতালোভীর সুযোগ নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কায়দায়- ভারতও এদেশের শিক্ষা সংস্কৃতি শিল্প বাণিজ্য পরিবেশ প্রকৃতি নদ নদী সবকিছুর উপর তাদের বেপরোয়া আগ্রাসন চালানোর আস্কারা পেয়েছে। সীমান্ত চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘণ লাগাতারভাবে করে যাচ্ছে। আমাদের ৫৪টি নদীতে তারা বাঁধ নির্মাণ করেছে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘণ করে। কারণ বাংলাদেশের জন্য ভারতের পররাষ্ট্রনীতি হায়দ্রাবাদ কৌশলের নীতি। এদেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলে ভারতের দালাল আছে। এসব দালালেরা হায়দ্রাবাদের বিক্রি হওয়া রাজনীতিবিদদের মতোই ভারতের স্বার্থে লড়াই করে।
মাদকাসক্ত চোর গ্রামের টিউবওয়েলের নাট বল্টু চুরি করে ৫/১০ টাকায় বিক্রি করে; কিন্তু টিউবওয়েল অকেজো হওয়ার কারণে পুরো গ্রাম পানির কষ্ট ভোগ করে। রাস্তার ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি করে কেউ ৫০০ টাকায় ভাঙ্গারি দোকানে বিক্রি করে দেয়- কিন্তু সেই খোলা ম্যানহোলে এক্সিডেন্ট করে মানুষও মারা যায়। আমাদের ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদেরা বিগত ৫২ বছর বাংলাদেশের নাট বল্টু আর ম্যানহোলের ঢাকনা বিক্রি করে করে ৫/১০ টাকা বা ৫০০ টাকা কামিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১৯ কোটি মানুষ ভারতের যাবতীয় আগ্রাসনের বলি হচ্ছে। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দান করুন- বাংলাদেশের জন্য ভারতের চেয়ে বড় ঝুঁকি এবং শোষক আর কেউ নাই।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোন আপস নয়; কোন ভয় অথবা নমনীয়তা নয়!
লেখক :এম. আর. হোসাইন জহির, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

