বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বৈরশাসকের সুবিধাভোগীরাই বিভিন্ন জেলার ডিসি

ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের অবসান হলেও বিগত সরকারের সুবিধাভোগীরাই বিভিন্ন জেলার ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। নতুন করে ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তিনজন ছাড়া বাকিদের সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী। এদের মধ্যে অন্তত ৫৬ জন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন ; কিংবা আওয়ামী লীগ নেতার নিকটাত্মীয়।
সচিবালয় সুত্র জানিয়েছে, নতুন ডিসি হিসেবে পদায়িতদের ৫৬ জনই আ’লীগ সরকার আমলে করা।  তালিকার। জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন পাওয়াদের মধ্য ফরিদা খানম, আজহারুল ইসলাম, হোসনা আফরোজা বিগত সরকারের রোষানলের শিকার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়োগ পান নি। এদের মধ্যে যশোরের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে  মো. আজহারুল ইসলামকে। এছাড়া  চট্টগ্রামের ডিসি নিয়োগ পেয়েছেন ফরিদা খানম। আর বগুড়ার ডিসি পদ পেয়েছেন হোসনা আফরোজা।
স্বৈরাচারী পতনের পর সেই সরকারের সমর্থক ও সুবিধাভোগী এই ১৬ কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীর একান্ত সচিব, স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতির মেয়ে ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ নেতার স্ত্রীকে জেলা প্রশাসক পদায়ন করা হয়েছে। বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করেছেন, এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন কয়েক জন।
ঢাকার ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তানভীর আহমেদ সাবেক আইন সচিব আবু সালেহ মো. জহিরুল ইসলামের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন। এ ছাড়া তিনি সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাজ্জাদুল ইসলাম শাহিনের নিকটাত্মীয়। ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় এমন কর্মকর্তার নিয়োগ প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পুরো প্রক্রিয়াকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় বিগত সরকারের সময় অতিরিক্ত সচিব সায়লা ফারজানা ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের দেওয়া ডিসি ফিটলিস্টে তানভীর আহমেদের নাম ছিল।
সুত্রমতে, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এমন অনেক কর্মকর্তাই জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়
কক্সবাজার জেলার ডিসি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত সরকারের সময় তিনি মোটা বেতনে একটি প্রকল্পে লিয়েনে পোস্টিং নিয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২০ আগস্ট সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি বিদ্যমান জেলা প্রশাসক পদায়ন নীতিমালা ও গত সরকারের তৈরি ডিসি ফিটলিস্ট বাতিল করা হয়। এরপর নতুন ফিটলিস্ট তৈরির জন্য টানা দুই সপ্তাহ বিসিএস ২৪, ২৫ ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি করা হয় ফিটলিস্ট। কিন্তু গত সোম ও মঙ্গলবার যে ৫৯ জনকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়, সেখানে গত সরকারের আমলে বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়া ও নানাভাবে কোণঠাসা থাকা মাত্র তিনজন কর্মকর্তা ঠাঁই পেয়েছেন। বাকি ৫৬ কর্মকর্তা গত ১৬ বছরে নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন। বেশির ভাগই ভালো পদায়ন নিয়ে দাপটের সঙ্গে চাকরি করেছেন। ছিলেন আওয়ামী লীগের করা ফিটলিস্টে, স্থান পেয়েছেন নতুন ফিটলিস্টেও।
অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা কর্মকর্তারাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এসে নতুন করে ডিসি পদে পদায়িত হয়েছেন। ৫৬ জনের মধ্যে অনেকেই বিদেশ মিশনে চাকরির সুযোগ পেয়েছেন আওয়ামী লীগের সরকারের তোষামোদের পুরস্কার হিসেবে। এরমধ্যে  ময়মনসিংহ জেলার ডিসি মফিদুল আলম চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের পিএস ছিলেন।
আ জ ম নাসির উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মফিদুল আলমকে নিয়ে নানা কানাঘুঁষা চলছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত সোমবার
প্রথম দফায় যে ২৫ জনকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়, তাদের মধ্যে মাত্র ১১ জন মেধায় চাকরি পেয়েছেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন কোটায় চাকরিতে এসেছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসি হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে সততা ও বৈষম্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেবার কথা থাকলেও হয়েছে উল্টো।

পদায়ন পাওয়া ২৫ জনের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে দু’জন বিগত সরকারের আমলে নানাভাবে বঞ্চিত ছিলেন। ২৩ জন নিয়মিত পদোন্নতিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাসময়ে পেয়েছেন। তারা আগের সরকারের ফিটলিস্টেও ছিলেন। এ ছাড়া এবার নারীরাও তুলনামূলক কম স্থান পেয়েছেন। ২৫ জনের মধ্যে নারী মাত্র তিনজন। এই তিন নারীর দু’জন বিগত দিনে বঞ্চিত।

এবারও ডিসি হিসেবে নিয়োগে বঞ্চিত হওয়া  কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সরকারের আমলে কোণঠাসা থাকা কর্মকর্তার বড় একটি অংশই এবারও ডিসি হতে পারেননি। বিগত দিনে প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে জসীম উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, নূরজাহান খানম শান্তা, মাহবুব হোসেন, মনিরুজ্জামান, শাহীন ইসলাম, বদরুল আলম লিটন, সাইফুল হাসান রিপন ও রেবেকা খানকে ডিসি না করায় অবাক হয়েছেন ব্যাচমেটদের অনেকে। একইভাবে ২৫তম ব্যাচের নুরুল করিম ভূঁইয়া, ইয়ারুল ইসলাম, সেলিম আহমেদ, হাসান হাবিব, জয়নুল আবেদীন, মুস্তাফিজুর রহমান, সগীর হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, নুরুল হাফিজ, তাহসীনা ইসলাম, আলীমুন রাজীব, এটিএম শরীফুল ইসলাম, মোতাকাব্বির আহমেদ, নজরুল ইসলাম, মিনারা নাজনীন এ দফায়ও বঞ্চিত হলেন।

প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ডিসিদের অনেকের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠতার  অভিযোগ উঠেছে।  উত্থাপিত অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

ঝিনাইদহের ডিসি মো. আবদুল আওয়াল কমলনগর ও কুমিল্লায় ইউএনও থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এরপরও বিগত সরকারের সময় তৈরি করা ফিটলিস্টে তাঁর নাম ছিল। মাগুরার ডিসি মো. অহিদুল ইসলাম গত সরকারের সময় পাঁচ বছর মরিশাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সচিবালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি চক্র এমন তালিকা তৈরি করে প্রশাসনে থাকা আওয়ামী বিরোধীদের সাথে বর্তমান সরকারের দুরত্ব করতে চেয়েছে।

গোপালগঞ্জের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে  মো. কামরুজ্জামানকে। তিনি বিগত সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় সৌদি আরবে কনসাল জেনারেল পদে নিয়োগ পেয়েছেন। রাজউকের পরিচালক ও হজ অফিসার হিসেবেও পোস্টিং পেয়েছেন। গত সরকারের সময় তৈরি করা ডিসির ফিটলিস্টে তাঁর নাম ছিল।

এছাড়া সিরাজগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ মনির হোসেন রাজউকের পরিচালক ছিলেন। তিনি সালমান এফ রহমানের সঙ্গে শেয়ারবাজার কারসাজির অপকর্মে জড়িত এবং তাঁর শতকোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জামালপুরের ডিসি হাসিনা বেগম ইউএনও হিসেবে নরসিংদীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাঁকে তৎকালীন ডিসি অনুপযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন।

আওয়ামীপন্থী দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া দক্ষ ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তোপের মুখে ৯ জেলা প্রশাসকের পদায়ন বাতিল করা হয়েছে। রদবদল করা হয় চারটি জেলার জেলা প্রশাসককে। এক দিনের ব্যবধানে ১৩ ডিসির নিয়োগে এমন পরিবর্তন করায় পদায়ন-প্রক্রিয়াতেই গলদ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে এই পদায়ন-প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এটি অনুসরণ করলে আগের সরকারের দলীয় বিবেচনায় যারা ফিটলিস্টে ছিলেন, তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফিটলিস্টে আসার কথা না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, জেলা প্রশাসক পদায়নের জন্য যে তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে কিছু পরিবর্তন করা হচ্ছে। সেখানে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের একজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন।

সর্বশেষ

আরও পড়ুন
বিষয়

শিশু নিখোঁজ হলে সবার আগে যা করবেন

৩ সেপ্টেম্বর বিকেলের ঘটনা। আমার বাসার সহকারীর আসল নাম...

চট্টগ্রামে বিয়ে শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা, নারীসহ নিহত ২

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার...