কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত সোমবার
প্রথম দফায় যে ২৫ জনকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়, তাদের মধ্যে মাত্র ১১ জন মেধায় চাকরি পেয়েছেন। বাকি ১৪ জন বিভিন্ন কোটায় চাকরিতে এসেছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিসি হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে সততা ও বৈষম্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেবার কথা থাকলেও হয়েছে উল্টো।
পদায়ন পাওয়া ২৫ জনের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে দু’জন বিগত সরকারের আমলে নানাভাবে বঞ্চিত ছিলেন। ২৩ জন নিয়মিত পদোন্নতিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাসময়ে পেয়েছেন। তারা আগের সরকারের ফিটলিস্টেও ছিলেন। এ ছাড়া এবার নারীরাও তুলনামূলক কম স্থান পেয়েছেন। ২৫ জনের মধ্যে নারী মাত্র তিনজন। এই তিন নারীর দু’জন বিগত দিনে বঞ্চিত।
এবারও ডিসি হিসেবে নিয়োগে বঞ্চিত হওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সরকারের আমলে কোণঠাসা থাকা কর্মকর্তার বড় একটি অংশই এবারও ডিসি হতে পারেননি। বিগত দিনে প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে জসীম উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, নূরজাহান খানম শান্তা, মাহবুব হোসেন, মনিরুজ্জামান, শাহীন ইসলাম, বদরুল আলম লিটন, সাইফুল হাসান রিপন ও রেবেকা খানকে ডিসি না করায় অবাক হয়েছেন ব্যাচমেটদের অনেকে। একইভাবে ২৫তম ব্যাচের নুরুল করিম ভূঁইয়া, ইয়ারুল ইসলাম, সেলিম আহমেদ, হাসান হাবিব, জয়নুল আবেদীন, মুস্তাফিজুর রহমান, সগীর হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, নুরুল হাফিজ, তাহসীনা ইসলাম, আলীমুন রাজীব, এটিএম শরীফুল ইসলাম, মোতাকাব্বির আহমেদ, নজরুল ইসলাম, মিনারা নাজনীন এ দফায়ও বঞ্চিত হলেন।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ডিসিদের অনেকের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠেছে। উত্থাপিত অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।
ঝিনাইদহের ডিসি মো. আবদুল আওয়াল কমলনগর ও কুমিল্লায় ইউএনও থাকা অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এরপরও বিগত সরকারের সময় তৈরি করা ফিটলিস্টে তাঁর নাম ছিল। মাগুরার ডিসি মো. অহিদুল ইসলাম গত সরকারের সময় পাঁচ বছর মরিশাসে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সচিবালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি চক্র এমন তালিকা তৈরি করে প্রশাসনে থাকা আওয়ামী বিরোধীদের সাথে বর্তমান সরকারের দুরত্ব করতে চেয়েছে।
গোপালগঞ্জের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে মো. কামরুজ্জামানকে। তিনি বিগত সরকারের আস্থাভাজন হওয়ায় সৌদি আরবে কনসাল জেনারেল পদে নিয়োগ পেয়েছেন। রাজউকের পরিচালক ও হজ অফিসার হিসেবেও পোস্টিং পেয়েছেন। গত সরকারের সময় তৈরি করা ডিসির ফিটলিস্টে তাঁর নাম ছিল।
এছাড়া সিরাজগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ মনির হোসেন রাজউকের পরিচালক ছিলেন। তিনি সালমান এফ রহমানের সঙ্গে শেয়ারবাজার কারসাজির অপকর্মে জড়িত এবং তাঁর শতকোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জামালপুরের ডিসি হাসিনা বেগম ইউএনও হিসেবে নরসিংদীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাঁকে তৎকালীন ডিসি অনুপযুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন।
আওয়ামীপন্থী দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া দক্ষ ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের তোপের মুখে ৯ জেলা প্রশাসকের পদায়ন বাতিল করা হয়েছে। রদবদল করা হয় চারটি জেলার জেলা প্রশাসককে। এক দিনের ব্যবধানে ১৩ ডিসির নিয়োগে এমন পরিবর্তন করায় পদায়ন-প্রক্রিয়াতেই গলদ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে এই পদায়ন-প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এটি অনুসরণ করলে আগের সরকারের দলীয় বিবেচনায় যারা ফিটলিস্টে ছিলেন, তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ফিটলিস্টে আসার কথা না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, জেলা প্রশাসক পদায়নের জন্য যে তালিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে কিছু পরিবর্তন করা হচ্ছে। সেখানে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের একজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন।

