ক্ষোভ ও হতাশা থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করতে চাইছেন, এমন খবর তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সারা দেশে। এ নিয়ে বিএনপিসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অধ্যাপক ইউনূস পদত্যাগ করুন, কোনো দলই সেটা চায় না। তবে দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় চায়।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বৃহস্পতিবার পদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠক শেষে অনির্ধারিত আলোচনায় তাঁর পদত্যাগের ভাবনার কথা বলেন। জানা যায়, এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন। প্রায়ই সড়ক আটকে আন্দোলন, সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া, রাষ্ট্রীয় কাজে নানা পক্ষের অসহযোগিতাসহ দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন তিনি। অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগের ভাবনার কথা জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
এর আগের দিন বুধবার ঢাকা সেনানিবাসে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কিছু বক্তব্য জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। তাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান ও তার মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠাসহ জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য ছিল।
এ পরদিনই অধ্যাপক ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে চান সেটা আলোচনা আসে। এটাকে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকে কৌশলগত হুমকি কি না, সেটিও বিবেচনায় নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্র থেকে জানা গেছে।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা তো ওনার পদত্যাগ চাই না। আমরা নির্বাচনের রোডম্যাপ চেয়েছি। তিনি কেন সেদিকে যাচ্ছেন না সেটা আমরা জানি না। এরপরও তিনি যদি দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে জাতি নিশ্চয়ই বিকল্প বেছে নেবে। কারণ এটা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটা রাষ্ট্রীয় ব্যাপার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি কী ভূমিকা নেয়, রাজনীতি–সচেতন ব্যক্তিরা সে দিকেই দৃষ্টি রাখছেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়েছে তাতে সম্ভাব্য সংকট বা অনিশ্চয়তা নিরসনে দলগুলোর মধ্যে একধরনের ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা গেছে। সেটি হচ্ছে, তাঁরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে পদত্যাগ না করতে অনুরোধ করবেন।
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা সরকারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত এমন কেউ কেউ এরই মধ্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক কথা বলেছেন। সবার মধ্যে একটা ঐকমত্য হয় যে অধ্যাপক ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকুন। তবে তাঁকে দ্রুত নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট পথনকশা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করতে হবে। এ ছাড়া সরকারের একজন উপদেষ্টাকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও অনেকে আলোচনায় এনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, তাঁরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চান। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাঁরা পথনকশা চেয়ে আসছেন। নির্বাচনের পথনকশা দিলে অনেক সংকটের সমাধান হয়ে যায়।
এ বিষয়ে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দেশের স্থিতিশীলতা চাই। একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। এর জন্য নির্বাচনের রোডম্যাপ চাওয়া কি অপরাধ? এখনকার পরিস্থিতিতে আমি বলব, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক, সবার ধৈর্য ধরা উচিত। বিশেষ করে সরকারের।
প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে চান, এ খবর জানাজানির পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হয়। গত রাতে সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বিএনপিকে আজ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সাক্ষাতের সময় দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বৃহস্পতিবার রাতেই এক বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার আহ্বান জানান। জামায়াত নেতা গতকাল বেলা ১১টায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় যান। তবে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ পাননি, আজ সন্ধ্যা ছয়টায় জামায়াতের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও চায় বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হোক। সে লক্ষ্যে গতকাল এক বিবৃতিতে অবিলম্বে বিচার,সংস্কার ও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন।
অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিপিবি। দলটির নেতারা গতকাল পল্টনে এক সমাবেশে বলেছেন, সুস্পষ্ট তারিখ ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন সংস্কার করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করুন।
অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে ফেলে দাবিদাওয়া আদায়ের রাজনীতি ও পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীম।
সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট ও জটিল পরিস্থিতিতে অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগ নয়, বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষকে সমঝোতামূলক সমাধানে পৌঁছার আহ্বান জানিয়েছে এবি পার্টি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যাপক ইউনূসের পদত্যাগের ভাবনা এখনো আগের পর্যায়ে রয়েছে। এ নিয়ে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাসহ বিভিন্ন মহল চিন্তিত। এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের দল এনসিপির নেতারা বৃহস্পতিবার রাতেই অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ওই রাতেই বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতার সঙ্গে এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দলের নেতাদের অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হয়।
এ ছাড়া জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ও ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীমের মধ্যেও ফোনে কথা হয় বলে জানা গেছে। আবার ইসলামী আন্দোলনের কার্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ পাঁচটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সৈয়দ রেজাউল করীম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, এবি পার্টির মহাসচিব আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, সারোয়ার তুষার প্রমুখ।
ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা আছে, তিনি প্রত্যাশাও তৈরি করেছেন। এখন তিনি চাইলেই একটা রাষ্ট্রকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে চলে যেতে পারেন না। এটা ক্ষোভ অভিমানের জায়গা না। তবে কেউ তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করলে বা চাপ প্রয়োগ করলে সেটা জনগণ দেখবে, রাজনৈতিক দলগুলো দেখবে।
ডেস্ক নিউজ/চট্টলা’২৪/জ

